Tag Archives: নামজারী

নামজারী

ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়ালের নামজারী

আজকের আলোচনার বিষয়ঃ ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়ালের নামজারী

 

ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়ালের নামজারী
ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়ালের নামজারী

 

ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়ালের নামজারী

১। ভূমি ম্যাপ ও রেকর্ড তৈরি, সংশোধন ও হালকরণের কার্যক্রমে জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইনে ১৪৪ ধারা ও তৎসংলগ্ন বিধি মোতাবেক পুরাদস্তুর কিস্তোয়ার সার্ভের মাধ্যমে সরেজমিনে জরিপ বা রিভিশনাল জরিপ চালিয়ে রেকর্ড ও ম্যাপ প্রকৃতির কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে বাংলাদেশ সরকারি রাজশাহী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহ জেলায় রিভিশনাল জরিপ চালু করেছেন।

২। ১৯৫৬ সালের ১৪ এপ্রিল একই সাথে সকল জমিদারী ও মধ্যস্বত্ব উচ্ছেদের সময় যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তার মোকাবিলা করার জন্য একটি সংক্ষিপ্ত জরিপ ও রেকর্ড সংশোধনী কার্যক্রম চালানো হয়। ১৯৫৬ সাল হতে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে সর্বনিম্ন ভূমি মালিকের নাম সরকারাধীন সরাসরি রেকর্ড করে তিন কপি হস্তলিখিত রেকর্ড প্রস্তুত করা হয়।

উক্ত রেকর্ডের এক কপি জেলা রেকর্ডরুমে রক্ষিত হয় এবং ভূমি প্রশাসন সংক্রান্ত ব্যাপারে অন্য দুই কপি যথাক্রমে সংশ্লিষ্ট রাজস্ব সার্কেল ও তহসিল অফিসে দেওয়া হয়। এসব রেকর্ডের অন্তর্বর্তীকালীন পরিবর্তন ও সংশোধন এবং হালকরণের ক্ষমতা মুখ্যত জমা খারিজ, জমা একত্রীকরণ ও নামজারীর মাধ্যমে জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১১৬ ১১৭ এবং ১৪৩ ধারা অনুযায়ী জেলা প্রশাসনের হাতে অর্পণ করা হয়, কিন্তু কার্যত দেখা গিয়েছে যে, এই সমস্ত কাজ সময় অনুযায়ী বিহিতভাবে সম্পন্ন হয় না।

৩। অন্তর্বর্তীকালীন রেকর্ড পরিবর্তন, সংশোধন ও হালকরণের প্রক্রিয়াকে বাংলাদেশের জনগণ নামজারী এবং বিশেষ ক্ষেত্রে জমা খারিজ নামে আখ্যায়িত করেন। মূলত সমগ্র পদ্ধতিটাকে ১৪৩ ধারা ও তৎসংলগ্ন রুল বা বিধি মোতাবেক রেকর্ড হালকরণ বলে নামকরণ করা উচিত যে যে অবস্থায় রেকর্ড আধুনিকীকরণের প্রয়োজন দেখা দেয় তার পূর্ণ ব্যাখ্যা এবং কিভাবে করা উচিত, তার বিধি ও পদ্ধতির ভিত্তি করে নিম্নলিখিত নির্দেশ দেয়া হলঃ

 

ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়ালের নামজারী
ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়ালের নামজারী

 

(ক) ভূমি মালিকের মৃত্যুতে নামজারী

(ক) ভূমি মালিকের মৃত্যুতে প্রায়ই যথারীতি নামজারী হয় না। এ ব্যাপারে একদিকে মৃত মালিকের উত্তরাধিকারিগণ যেমন ক্রমাগতই গাফলতি করতে থাকেন তেমনি তহসিলদারগণও সরকারি এস্টেটস ম্যানুয়ালের ৮৩ নিয়ম মোতাবেক স্ব-স্ব ভূমিকা পালন করেন না। ফলত, স্বল্পক্ষেত্রেও সচরাচর আইনানুগ ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয় না।

(খ) এই ব্যাপারে যে যে অসুবিধা পরিলক্ষিত হচ্ছে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নি প্রদত্ত হল-

(গ) ভূমি মালিকের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীগণ প্রায়ই স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে রেকর্ড সংশোধনের জন্য আগ্রহী হন না।

(ঘ) যে স্বল্প সংখ্যক ক্ষেত্রে নামজারীর আবেদন দাখিল হয়, সেসব ক্ষেত্রেও প্রায়ই সত্য গোপন করতঃ আবেদনকারীদের সুবিধামত নামজারী করার প্রবণতা দেখা যায়। সাধারণত পুরুষ উত্তরাধিকারীগণ কর্তৃক মেয়েদের উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত করার প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। 

(ঙ) তহসিলদারগণ ভূমি মালিকদের মৃত্যুর কোন খবর সাধারণত রাখেন না।

(চ) ভূমি রাজস্ব আদায়ের তাগিদে তাঁরা কখনও কখনও গ্রামে গেলেও ভূমি রেকর্ড সংশোধনের ব্যাপারে তাঁদের প্রায়ই কোন মনোযোগ থাকে না।

(ছ) তহসিলদারগণ নামজারীর দরখাস্ত পাওয়া সত্ত্বেও উক্ত দরখাস্ত নিষ্পত্তির ব্যাপারে ঔদাসীন্য প্রদর্শন করেন। 

(জ) ফারায়েজ ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইন-কানুন সম্পর্কে তহসিলদারদের জ্ঞানের অভাবও তাদের এই অনীহার একটি কারণ। 

(ঝ) এই পরিস্থিতির আরও একটি কারণ এই যে, তহসিল অফিসে পরিবারভিত্তিক কোন রেকর্ড নাই। জন্ম-মৃত্যুর হিসাব বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক, যথা—কখনও ইউনিয়ন পরিষদ, কখনও বা সেনিটারী ইন্সপেক্টর কর্তৃক রক্ষিত হয় আসছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, ভারতের হরিয়ানা, রাজস্থান ইত্যাদি অঞ্চলে এবং পাঞ্জাবে পাটোয়ারিগণ “শজরায়ে নসব বা বংশানুক্রম লিপি নামে একটি রেকর্ড রেখে থাকেন। এর ভিত্তিতে কোন ভূমি মালিকের কোন কোন ওয়ারিশ জমির দাবিদার তা সহজেই নির্ধারণ করতে পারা যায়।

(ঞ) তহসিলদারগণের পক্ষে অনেকেই এ কথা বলেছেন যে, আদায়, হিসাব- নিকাশ ও ট্রেজারীতে টাকা দাখিলের কাজ এতই অধিক যে ওগুলো সমাধা করার পর তার পক্ষে রেকর্ড হালকরণের কাজের অবকাশ থাকে না। 

৪। অতএব, নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে যে—

(ট) সরকারি ম্যানুয়ালের ৮৩ ধারা মোতাবেক যে কোন ভূমি মালিকের মৃত্যু হলে স্থানীয় তহসিলদার ওয়ারিশগণের উপর একটি নোটিস দান করতঃ মুসলমানদের ফারায়েজ বা হিন্দু ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রচলিত আইন মোতাবেক স্ব-স্ব হিস্যা প্রদর্শন করত নামজারীর দরখাস্ত পেশ করতে নির্দেশ দান করবে।

(ঠ) ওয়ারিশগণকে অত্র নির্দেশে নিজ নিজ নাম, ঠিকানা, জমির বিবরণ ও সম্পত্তিতে তাহাদের হিস্যা সঠিকভাবে লিপিবন্ধের জন্য উপদেশ দান করবেন।

(ড) অতঃপর একজন তহসিলদার সরেজমিনে তদন্ত করে তারই ভিত্তিতে নামজারী করিবার সুপারিশসহ দরখাস্তগুলো থানা রাজস্ব অফিসে দাখিল করবেন।

(ঢ) থানা রাজস্ব অফিসার অতঃপর নামজারীর নিমিত্ত একটি কেস শুরু করিবেন ও সংশ্লিষ্ট সকল সম্ভাব্য মালিকদের শুনানী দান করে নামজারীর হুকুম দান করবেন।

 

ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়ালের নামজারী
ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়ালের নামজারী

 

৫। রেজিস্ট্রি দলিল মূলে জমি হস্তান্তর ও নামজারীঃ

ভূমি হস্তান্তর আইন (Transfer of Property Act) এর বিধান মোতাবেক একশত টাকার অতিরিক্ত মূল্যের যে কোন সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল রেজিস্ট্রি করা আইনগতভাবে অবশ্য করণীয় । এছাড়া দান, ওয়াকফ, ইত্যাদির ক্ষেত্রেও রেজিস্ট্রি দলিল মূলে জমি হস্তান্তরের বিধান রয়েছে। প্রচলিত বিধি অনুযায়ী রেজিস্ট্রি দলিল মূলে জমি হস্তান্তর হলে রেজিস্ট্রির সময় জমি হস্তান্তরের নোটিস দাখিল করতে হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য এই যে, নোটিস প্রাপ্তির পর সার্কেল অফিসার (রাজস্ব) একটি নামজারীর কেস চালু করবেন এবং যথাযথ শুনানীর পর হস্তান্তর নোটিসের ভিত্তিতে পূর্বতন খতিয়ান সংশোধন করতঃ দলিলগ্রহীতার নামে দলিলের তফসিল বর্ণিত জমি রেকর্ড করা উচিত ।

তবে দলিলগুলো পরীক্ষা করার পর সাধারণত অনেক ত্রুটি লক্ষ করা যায়। এ বিষয়ের বিশদ ব্যাখ্যা নিম্নে দেয়া হল 

(ক) ভূমি হস্তান্তর নোটিসগুলো প্রায় ক্ষেত্রেই অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্যভাবে লিপিবদ্ধ থাকে। দলিলদাতা ও দলিলগ্রহীতার নাম, জমির তফসিল ও দলিল সম্পর্কিত তথ্যাদি এই নোটিসে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয় না। 

(খ) রেজিস্ট্রি দলিলগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এতে শুধু গদবাধা অবাস্তব কথাগুলোর প্রাধান্য থাকে, কিন্তু জমির তফসিল ও আবশ্যকীয় বিবরণ এবং অধিকার ও স্বত্ত্বের ধারাবাহিক ইতিহাস প্রায়ই অসম্পূর্ণ থাকে। ফলে, দলিলগুলো প্রায় ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তিকর ও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

(গ) দলিলদাতার জমির উপর মালিকানা ও দখল আছে কিনা এবং বর্তমান ক্ষেত্রে তার জমি হস্তান্তরের অধিকার আছে কিনা রেজিস্ট্রির সময় তার প্রতি কোন নজর দেওয়া হয় না এবং তা পরীক্ষা করার কোন আইনগত বিধানও নাই।

(ঘ) উপরোক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভাবে রেজিস্ট্রি দলিল মূলে ভূমি হস্তান্তরের নানা প্রকার জালিয়াতি ও প্রবঞ্চনা সংঘটিত হতে দেখা যায় এবং নামজারী ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে এটি এক বিশেষ প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

(ঙ) শহরাঞ্চলের জায়গা-জমি হস্তান্তর করতে হলে আয়কর পরিশোধ সার্টিফিকেট দেখাবার বিধান রয়েছে। কিন্তু অনুরূপভাবে বিক্রিত জমির খাজনা, কর ইত্যাদি পরিশোধের দাখিলা প্রদর্শনের কোন বিধান নেই। এতে সার্টিফিকেট আবদ্ধ জমিও হস্তান্তরিত হয়ে যায় এবং ১৯১৩ সালের সার্টিফিকেট আইনের ৮ ধারার আওতায় পড়ে উক্ত হস্তান্তর আইনগত অশুদ্ধ হওয়ায় নামজারীতে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় । 

(চ) সাব-রেজিস্ট্রারগণ রেজিস্টির কয়েক বৎসরের মধ্যেও ক্রেতাকে মূল দলিল প্রদানে সক্ষম হন না। এতে স্বভাবতই নামজারী বিলম্বিত হয়ে পড়ে।

(ছ) ভূমি হস্তান্তর নোটিস পাঠাবার ব্যাপারে দেখা যায় যে, সাব-রেজিস্ট্রারগণ নিয়মিত নোটিসসমূহ রাজস্ব কর্মচারিগণের নিকট না পাঠিয়ে দীর্ঘদিন পর বহু নোটিস একত্রিত করে এককালিন পাঠিয়ে থাকেন। এতে উক্ত নোটিস পাঠাবার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যায়।

এমন কি সার্কেল অফিসে উক্ত নোটিসসমূহ তহসিলওয়ারী বাছাই করাও বস্তুত দুরূহ হয়ে পড়ে। অনেকগুলো নোটিস একত্রে প্রেরণের এই দীর্ঘসূত্রিতা এবং অবস্থা এর মূল উদ্দেশ্যকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করেছে। আমরা মনে করি যে, রেজিস্ট্রি দলিলে সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত ফরম বা (pro forma)-তে দলিল রেজিস্ট্রি অফিসে দাখিল ও খতিয়ান বা রেকর্ডের সাহায্যে জমির মালিকানা ইত্যাদি পরীক্ষা করার পর দলিল চূড়ান্ত করা উচিত। যথাসময়ে আমরা এ লক্ষ্যবস্তু অর্জনে সরকারের নিকট সংশোধনী প্রস্তাবনা পেশ করব।

থানা রাজস্ব অফিসারগণের রেজিস্ট্রি দলিলমূলে হস্তান্তরকৃত সম্পত্তির নামজারীর জন্য নিম্নলিখিত কর্মপন্থা গ্রহণ করা উচিত।

(জ) ভূমি হস্তান্তর নোটিসগুলোর প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই নতুন মালিকদেরকে নামজারী করবার নির্দেশনামা দেয়া। 

(ঝ) নামজারীর নিমিত্ত কাগজপত্র ও দলিলের কপি দাখিল করা হলে নামজারীর কেইস করা ও অতঃপর রেকর্ডের সাথে এর মোকাবিলা ও প্রয়োজনীয় তদন্ত ও পরীক্ষাকরণ।

(ঞ) সঠিক পাওয়া গেলে নামজারীর হুকুম প্রদান ।

 

ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়ালের নামজারী
ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়ালের নামজারী

 

৬। খাজনা অনাদায়ে জমি বিক্রি ও তৎসংশ্লিষ্ট নামজারী সার্টিফিকেটঃ

কোর্ট ডিক্রিমূলে নিলামে জমি বিক্রি হলে তার ভিত্তিতে যথাযথ নামজারী হয় কিনা এবং তাতে কি কি অসুবিধা রয়েছে এ বিষয়ে পরীক্ষা করবার সময় শৃঙ্খলা নিয়মানুবর্তিতার বিশেষ অভাব লক্ষ করেছেন।

জমিদারী উচ্ছেদের পর সরকারি রাজস্ব আদায়ের জন্য সার্টিফিকেট প্রথা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সিভিল কোর্ট ডিক্রীমূলে জমি বিক্রয়ের ব্যবস্থা বকেয়া খাজনা আদায়ের বিধান হিসাবে প্রচলিত রয়েছে। অভিজ্ঞতা হতে দেখা যায় যে, জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের পর বকেয়া ভূমি রাজস্ব ও আনুষঙ্গিক করাদি আদায়ের ব্যাপারে বহুবিধ কারণে ১৯১৩ সালের “দি বেঙ্গল পাবলিক ডিমাণ্ডস রিকভারী এ্যাক্ট”-এর কার্যকারিতা পূর্বের তুলনায় বহুলাংশে হ্রাস পায়।

এর ফলে ভূমি রাজস্ব বকেয়া ক্রমশই বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং সার্টিফিকেট কেসের সংখ্যা গগণচুম্বী আকার ধারণ করে। অবশ্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই বকেয়া ভূমি রাজস্ব মওকুফ ও ভূমি রাজস্ব সংক্রান্ত সার্টিফিকেট কেসসমূহ বাতিল ঘোষণা করা সার্টিফিকেট কেসের সংখ্যা অনেক হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে সার্টিফিকেটের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে অধিক সময় লাগবে না।

দেয় ভূমি রাজস্ব ও আনুষঙ্গিক করাদি যথাসময়ে আদায়ের নিশ্চয়তা বিধানে সার্টিফিকেট প্রথার গুরুত্ব অত্যধিক এবং সার্টিফিকেট কেসসমূহের আশু নিষ্পত্তি ব্যতিরেকে ভূমি রেকর্ড হালকরণের প্রয়াস কখনও সফলকাম হতে পারে না। বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে নিম্নলিখিত নির্দেশ দেয়া গেল।

৮। (ক) বকেয়া খাজনা বা অন্যান্য সরকারি পাওনা আদায়ের জন্য সার্টিফিকেট কোর্টে কোন মামলা দায়ের করার সময় সার্টিফিকেট দায়েরকারী যাতে জমির সঠিক ও পূর্ণ বিবরণ, জমির স্বত্ব ও দখল, জমিতে দায়িকের হিস্যা, জমির পরিমাণ ও দাগ নম্বর এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিবরণাদি সঠিকভাবে উল্লেখ করেন তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।

(খ) ভূমি রাজস্ব ও সংশ্লিষ্ট করাদি আদায় এবং ভূমি রেকর্ড হালকরণের স্বার্থে সার্টিফিকেট প্রথাকে কার্যকরী করতে হলে রাজস্ব কর্মচারিগণকে অধিক তৎপর হতে হবে এবং কেস-রেজিস্টার ও অন্যান্য অফিস রেকর্ডাদি যাতে যথানিয়মে রক্ষিত হয়। এবং সার্টিফিকেট-কেস শুনানীর নোটিসাদি যাতে সময়মত ঠিকভাবে জারি হয় এবং নির্ধারিত তারিখ মোতাবেক যাতে শুনানী সম্পন্ন করা হয় তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।

পরিদর্শনকারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণের এ ব্যাপারে বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। নিয়মিত কার্যকর পরিদর্শনের মাধ্যমে সার্টিফিকেট সংক্রান্ত রেজিস্টারসমূহের মোকাবেলা ও কাজের অগ্রগতির উপর তাদেরকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

(গ) সার্টিফিকেট কেসের সংখ্যা অনুযায়ী ষ্টাফ নিয়োজিত করার ব্যবস্থা করতে হবে এবং তারা যাতে নিজ দায়িত্ব সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাদেরকে আবশ্যকীয় প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা করতে হবে।

(ঘ) নিলাম বহাল হওয়ার সাথে সাথেই সার্টিফিকেট অফিস হতে নামজারীর জন্য রাজস্ব সার্কেল অফিসে নির্দেশ প্রেরণ করতে হবে এবং সেই সঙ্গে বায়নানামা ও দখলনামার অনুলিপিও পাঠাতে হবে। সার্টিফিকেট বিক্রীত জমির দখল হস্তান্তর ও দখলনামা প্রদান যাতে সরেজমিনে সাধিত হয় তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে, যাতে পরবর্তীকালে জবরদখল সংক্রান্ত কোন সমস্যার উদ্ভব না হয় ।

(ঙ) সিভিল কোর্টের মাধ্যমে ভূ-সম্পর্কিত নিলাম হতে নোটিস প্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসার একটি ‘মিস কেস’ চালু করে নামজারীর ব্যবস্থা করবেন। এ সব ক্ষেত্রেও বায়নানামা, দখলনামা ও ভূমি হস্তান্তরের নোটিস যথারীতি সংযুক্ত থাকতে হবে। সার্কেল অফিসার বায়নানামা ও দখলনামা পরীক্ষা করে তাতে কোন ভুল বা অসম্পূর্ণতা পরিলক্ষিত হলে তা সংশোধন করার জন্য সাথে সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এই হেতু নামজারী কার্যক্রম যাতে বিলম্বিত না হয় তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।

 

 

নামজারীর কার্যক্রম

সার্টিফিকেট কেস ও কোর্ট কেসের ফলাফলের ভিত্তিতে জমি বিক্রি হওয়ার পর বিষয়টি চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলে নামজারী করা সহজ ব্যাপার। তবে একটি নামজারী কেস শুরু করে একটি শুনানীর মাধ্যমেই অত্র কেস ফয়সালা করা ও এর ফলাফল লিপিবন্ধ করার জন্য খতিয়ান সংশোধন করা উচিত।

চূড়ান্তকরণ ও রেকর্ড হালকরণ

নামজারী মামলা চূড়ান্ত করার নিমিত্ত থানা রাজস্ব অফিসারগণ ১৪৩ ধারা সংলগ্ন বিধি বা রুল মোতাবেক কাজ করবেন। বিষয়টা চূড়ান্ত হয়ে গেলেই এহেন চিহ্নিত সম্পত্তির জন্য পৃথক খতিয়ান করতে হবে। খতিয়ানের নম্বর সঠিক রাখার নিমিত্ত এ সমস্ত পৃথক খতিয়ানে বাকি নম্বর এস্তেমাল করতে হবে। অতঃপর তলবকারী রেজিস্টার বা দুই নম্বরে রেজিস্টারীতে আরও একটি হোল্ডিং বা জমার সৃষ্টি করতে হবে।

ভূমি মালিকের মৃত্যুতে অথবা রেজিস্ট্রি দলিলমূলে জমি ক্রয় ক্ষেত্রে অথবা অন্য কোন উপায়ে কোন মালিকের জমি বৃদ্ধি পেলে বিষয়টি জমিদারী দখল ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯০ ধারা মোতাবেক অথবা ১৯৭২ সালে জারিকৃত ৯৮ নং আইনের প্রেক্ষিতে বিবেচনা ও পরীক্ষা করতে হবে। যদি অত্র মালিকের সমুদয় সম্পত্তি এই আইনসমূহের প্রকোপে পড়ে বাজেয়াপ্ত হয়ে যায় তা হলে মিউটেশন কেসের সাথে আর একটি পৃথক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

আইনের বিধান অনুযায়ী অত্র মালিককে তার সংরক্ষণ ক্ষমতার ভিতরে কোন কোন সম্পত্তি তিনি রাখতে চান তার যথাযথ শুনানী দান করে নামজারীর কেস ও অত্র বিবিধ কেসে একই যোগে আদেশ দান করতে হবে। বলা বাহুল্য যে, অত্র আদেশ মতেই এ ক্ষেত্রে খতিয়ান সংশোধিত হবে।

বর্তমানে হাউজিং সোসাইটি ও বিভিন্ন কোম্পানি বেপরোয়াভাবে সম্পত্তি আয়ত্ত করার নিমিত্ত অনেক ক্ষেত্রে জমিদারী দখল ও প্রজাস্বত্বের আইনের ১০ ধারা অথবা বাংলাদেশ (Land Holding (Limitation) Order, 1972] অর্থাৎ (১৯৭২ সালের পি. ও. ৯৮) আওতায় পড়ে অতিরিক্ত সম্পত্তি ছেড়ে দেওয়া প্রকোপে পড়েছেন। নামজারী করতে যেয়ে এই সমস্ত ক্ষেত্রেও অনুরূপ ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে।

জমির নামজারি ও জমাভাগ/জমা একরিকিণ এর আদ্যোপান্ত (Mutation)

আজকে আমরা আলোচনা করবো জমির নামজারি (Mutation) সম্পর্কে। সরকার রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনসহ এতদসংক্রান্ত অন্যান্য আইনের বিধানবলে দীর্ঘকাল পর পর ভূমি জরিপের মাধ্যমে ভূমির মালিকানা স্বত্বলিপি ( মৌজা ম্যাপ ও খতিয়ান) প্রস্তুত করে। জরিপ-পরবর্তী সময়ে খতিয়ানে রেকর্ডীয় ভূমি মালিকের মৃত্যুতে উত্তরাধিকার সূত্রে কিংবা রেকর্ডীয় মালিক বা তার উররাধিকারীগণ হতে ক্রয়-বিক্রয় বা বিভিন্নভাবে হস্তান্তর সূত্রে মালিকানা পরিবর্তনের ফলে উক্ত ভূমিস্বত্ব হালনাগাদ করার জন্য সহকারি কমিশনার(ভূমি)র নিকট নামজারি আবেদন করতে হয়।

 

 

জমির নামজারি (Mutation)

 

জমির নামজারি (Mutation)

যার নামে ভূমি রেকর্ড তার নামেই সাধারণত ভূমি কর/খাজনা প্রদান করতে হয়। কোন ব্যক্তি ভূমির মালিকানা অর্জন করলে তার নামে খাজনা কর দেয়ার সুবিধার্থে তার নামে সরকারি রেকর্ড সংশোধন করে আপ-টু-ডেট করতে হয়। নতুন মালিকের নাম রেকর্ডভূক্তকরণের আইনানুগ প্রক্রিয়াকে নামজারি (Mutation) বলে। জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এর ১৪৩ ধারায় এবং ১৯৯০ সনের বাংলাদেশ ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়েলের ৩০৯ হতে ৩৩২ নং পর্যন্ত অনুচ্ছেদে নামজারি ও তৎসংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

যে সমস্ত কারণে জমির মালিকানার পরিবর্তন ঘটে থাকে তা সংক্ষেপে নিম্নে বর্ণিত হল:

(ক) মালিকের মৃত্যুতে আইনানুগ ওয়ারিশ বা ওয়ারিশগণের অনুকূলে মৃতের অংশীয় জমির মালিকানা পরিবর্তিত হয়ে থাকে ।

(খ) রেজিস্ট্রি দলিলমূলে জমি বিক্রি, দান, হেবা, ওয়াকফ বা উইলমূলে ক্রেতা বা গ্রহীতার অনুকূলে মালিকানা হস্তান্তরিত বা পরিবর্তিত হতে পারে।

(গ) খাস জমি স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হলে বিধিমতে খাস জমি বিক্রি করে দেয়া হলে বন্দোবস্তী প্রাপক বা ক্রেতার অনুকূলে মালিকানার পরিবর্তন ঘটে থাকে।

(ঘ) সরকার কারো সম্পত্তি অধিগ্রহণ করলে বা ক্রয় করলে সরকারের অনুকূলে মালিকানার পরিবর্তন ঘটে। 

(ঙ) নিলাম বিক্রির মাধ্যমে নিলাম ক্রেতার অনুকূলে জমির মালিকানার পরিবর্তন ঘটে থাকে।

(চ) সিকস্তি বা জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১০, ১১, ১২ ও ৯৩ ধারার আওতায় কোন মালিকের স্বত্ব বিলোপ হলে মালিকানা সরকারের অনুকূলে পরিবর্তিত হয়।

(ছ) স্বত্ব ঘোষণা সংক্রান্ত দেওয়ানী মামলার স্বত্ব ঘোষণামূলক ডিক্রি বা আদেশ বলে সংশ্লিষ্ট জমির মালিকানা ডিক্রি প্রাপকের অনুকূলে হস্তান্তরিত হতে পারে।

 

১। নামজারি মামলার ধারাবাহিক স্তরঃ

ভূমি ব্যবস্থাপনায় নামজারি একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। হালনাগাদ রেকর্ড সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নামজারি একটি অপরিহার্য। নাম। সংশোধনী জরিপের মাধ্যমে রেকর্ড হালনাগাদ সংশোধনের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু নানা কারণে এটি ঘন ঘন করা যায় না। ফলে মূল বা সি এস. জরিপ বা কোন সংশোধনী জরিপ হতে পরবর্তী সংশোধনী জরিপের মধ্যবর্তী সময়ে ভূমি মালিকানায় যে পরিবর্তন সাধিত হয় তা রেকর্ডকরণের জন্য যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় তা-ই নামজারি। এই পদ্ধতি সুষ্ঠু সম্পাদনের ফলে ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের জটিলতা, ভূমি সংক্রান্ত বিবরণ ও মামলা-মোকদ্দমা ইত্যাদি বহুলাংশে হ্রাস পায়। একটি নামজারি মোকদ্দমায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় তা নিম্নে আলোচনা করা হলো

(ক) মামলা দায়েরঃ

বিভিন্নভাবে নামজারি মামলা দায়ের হতে পারে। এর মধ্যে নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য

(১) নতুন মালিকের আবেদনের প্রেক্ষিতে নামজারি মামলা দায়ের হতে পারে। এরূপ ক্ষেত্রে আবেদনকারী কিসের ভিত্তিতে এবং কি ধরনের নামজারি চান তা তার আবেদনপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। এক্ষেত্রে আবেদনকারীকে আবেদনপত্রের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কোর্ট ফি প্রদান করতে হবে।

(২) সাব-রেজিস্টার জেলা রেজিস্টার বা অন্যকোন আদালত হতে প্রাপ্ত ভূমি হস্তান্তর নোটিসমূলে নামজারি মামলা দায়ের হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে, প্রায় ক্ষেত্রেই এসব ভূমি হস্তান্তর নোটিস অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্যভাবে লিপিবদ্ধ থাকে। দলিলদাতা ও দলিলগ্রহীতার নাম, জমির তফসিল ও জমি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যাদি এ নোটিসে। যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ থাকে না।

অধিকন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে ভূমি হস্তান্তর দলিল সম্পাদনের সময় ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা প্রদর্শনের কোন বিধান না থাকায় সার্টিফিকেট আবদ্ধ জমিও হস্তান্তরিত হয়ে থাকে। কিন্তু ১৯১৩ সনের সরকারি পাওনা আদায় আইনের ৮ ধারানুযায়ী অনুরূপ হস্তান্তর বেআইনী হওয়ার ভূমি হস্তান্তর নোটিসমূলে নামজারি মামলা দায়ের ও নিষ্পত্তি করা অসুবিধাজনক হয়ে পড়ে……

উপরোক্ত অবস্থায় ভূমি হস্তান্তরে নোটিসমূলে নামজারি মামলা দায়ের করার পূর্বে উক্ত নোটিসে বর্ণিত ক্রেতাকে নামজারি করার নির্দেশনামা প্রেরণ করা এবং নামজারি করার জন্য কাগজপত্র ও দলিলের কপি দাখিল করা হলে তার ভিত্তিতে নামজারি মামলা দায়ের করা বাঞ্ছনীয়। অধিকন্তু উক্ত নোটিসে দলিলগ্রহীতা ও দলিলদাতার নাম ও ঠিকানা স্পষ্টভাবে উল্লিখিত না থাকলে তা সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্টার, জেলা রেজিস্টার বা আদালতে নামজারি কার্যক্রম গ্রহণ করতে না পারার কারণ ব্যাখ্যা করে সংশোধিত নোটিস প্রেরণের জন্য ফেরৎ পাঠানো উচিত।

(৩) ১৯৯০ সনের বাংলাদেশ ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়ালের ৩১৪ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তহসিলদার কর্তৃক প্রদত্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে নামজারি মামলা দায়ের করা যেতে পারে।

(৪) ১৯৮৭ সনের খাস কৃষিজমি বণ্টন নীতিমালার আওতায় বন্দোবস্ত প্রদত্ত জমির সম্পাদিত কবুলিয়তের কপির ভিত্তিতে নামজারি মামলা দায়ের করা যেতে পারে। 

(৫) সার্টিফিকেট আদালত বা দেওয়ানী আদালত হতে নিলামকৃত সম্পত্তির নামজারির নির্দেশ বা নোটিশ এবং তার বায়নানামা ও দখলনামার অনুলিপি প্রাপ্তির পর তার ভিত্তিতে নামজারি মামলা দায়ের করা যেতে পারে।

উপরোক্ত যে কোন পদ্ধতিতে নামজারি মামলা দায়ের করার পর পরই থানা ভূমি অফিসে সংরক্ষিত রেজিস্টার (LIX) (নামজারি রেজিস্টার)-এ লিপিবদ্ধ করতে হবে। জমাভাগ বা উত্তরাধিকার সূত্রে নামজারির আবেদনের প্রেক্ষিতে অথবা ১৯৯০ সনের ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়ালের ৩১৪ নং অনুচ্ছেদের বিধান মতে তহসিলদারের রিপোর্টের ভিত্তিতে দায়েরকত্ব নামজারি মামলাসমূহ উক্ত রেজিস্টারের ১ম খণ্ডে এবং ভূমি হস্তান্তর নোটিস বা খাস জমি বণ্টন নীতিমালা ১৯৮৭-এর আওতায় সম্পাদিত কবুলিয়তের ভিত্তিতে অথবা সার্টিফিকেট আদালত ও দেওয়ানী আদালত হতে নিলামকৃত সম্পত্তির নামজারির নির্দেশ নোটিস ইত্যাদির ভিত্তিতে দায়েরকৃত নামজারি মামলাসমূহ উক্ত রেজিস্টারের ২য় খণ্ডে লিপিবদ্ধ করা উচিত।

 

জমির নামজারি (Mutation)

 

(খ) মামলা তহসিলদারের নিকট তদন্তের জন্য প্রেরণঃ

নামজারির মামলা রুজু হওয়ার পর প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে মতামত বা প্রস্তাবসহ প্রতিবেদন প্রদানের জন্য তহসিলদারের নিকট প্রেরণ। এতদুদ্দেশ্যে প্রতিটি কেইস নথি এখতিয়ারসম্পন্ন তহসিলদারের নিকট প্রেরণ করা হয়। এরূপ কেইস নথি প্রেরণকালে তা যথারীতি কেইস মুভমেন্ট রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করে প্রেরণ করতে হয়। কেইস প্রেরণে যাতে অযথা বিলম্ব না হয় সেদিকে বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে।

(গ) ইউনিয়ন ভূমি অফিসের রেজিস্টার (LX) এর লিপিবদ্ধকরণঃ

 থানা ভূমি অফিস হতে স্থানীয়ভাবে তদন্তের আদেশসহ প্রাপ্ত নামজারি মামলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নামজারি রেজিস্টার (LIX)-এর প্রথম খণ্ডে অথবা দ্বিতীয় খণ্ডে বিধিমত লিপিবদ্ধ করতে হয়।

(ঘ) নামজারি প্রস্তাব প্রস্তুতকরণঃ

থানা ভূমি অফিস হতে প্রাপ্ত নামজারি মামলা যথারীতি রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করার পর তহসিলদার নিম্নে বা তার অফিসে কর্মরত অন্যকোন সহকারী তহসিলদারকে দিয়ে নামজারি প্রস্তাব প্রস্তুতির কার্যক্রম গ্রহণ করবেন। তিনি প্রথমে তার অফিসের ১ নং রেজিস্টার বা খতিয়ান বহি, ৮ নং রেজিস্টার বা খাস জমির রেজিস্টার, ৯ নং সার্টিফিকেট রেজিস্টার, অর্পিত সম্পত্তি তালিকা। রেজিস্টার বা সেন্সর লিস্ট ও পরিত্যক্ত সম্পত্তির রেজিস্টার ইত্যাদি পরীক্ষা করে দেখবেন।

এসব রেজিস্টার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যদি দেখা যায় যে, মামলা অন্তর্ভুক্ত জমি সরকারি সম্পত্তি এবং এর নামজারি মঞ্জুর করা বিধিসম্মত নয় তবে তিনি তার বিস্তারিত বিবরণ প্রদান পূর্বক নামজারি মামলা খারিজ বা নামজারি আবেদন বাি করার প্রস্তাব প্রস্তুত করবেন আর যদি দেখা যায় যে, মামলার অন্তর্ভুক্ত সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি তবে তিনি মামলার পক্ষগণকে ও রেকর্ডভুক্ত মালিকদেরকে নোটিস দ্বারা অবগত করে সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট জমির দখল সংক্রান্ত বিষয় পরীক্ষা করে দেখবেন এবং সংশ্লিষ্ট দলিল ও কাগজপত্রাদি পর্যালোচনা করে দেখবেন।

জমাভাগের ক্ষেত্রে প্লট বিভাজনের প্রয়োজন হলে বিধানমত প্লট বিভাজন ি আদায় করে পক্ষগণের সম্মতিক্রমে সরেজমিনে প্লট বিভাজন করে প্রচলিত মৌজা মেপে তা প্রদর্শন করবেন এবং বিভাজিত প্লট ট্রেসপূর্বক তাতে পক্ষগণের সম্মতিসূচক স্বাক্ষর গ্রহণ করে প্রস্তাবের সাথে সংযুক্ত করবেন।

বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বিক্রেতার সংশ্লিষ্ট ভূমি বিক্রয়ের অধিকার ছিল কিনা অথবা কতটুকু পরিমাণ ভূমি বিক্রয়ের বৈধ অধিকার বা ক্ষমতা ছিল এসব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। উত্তরাধিকারসূত্রে নামজারির ক্ষেত্রে আবেদনকারী কর্তৃক দাখিলকৃত উত্তরাধিকারের সনদপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। কোন আইনানুগ উত্তরাধিকারীকে অন্যায়ভাবে বা ভুলক্রমে বা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে কিনা তা তহসিলদার সরেজমিনে তদন্তকালে স্থানীয় লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে নিশ্চিত হবেন।

উত্তরাধিকার প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ম্যাজিস্ট্রেট (১ম শ্রেণীর), ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা স্থানীয় এম. পি. হতে প্রাপ্ত উত্তরাধিকার প্রত্যয়নপত্র দাখিল করতে হবে। মুসলমানদের ক্ষেত্রে মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক বা উকিল প্রদত্ত “ফারায়েজ” এবং হিন্দুদের ক্ষেত্রে পণ্ডিত বা উকিল প্রদত্ত উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির পরিমাণ সম্পর্কিত প্রত্যয়নপত্র নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করা যাবে। নামজারির দরখাস্তে উল্লিখিত জমির জন্য বকেয়া ভূমি রাজস্বের দায়ে বা অন্য কোন ঋণের দায়ে সার্টিফিকেট দায়ের করা হয়েছে কিনা তা বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে হবে।

নামজারি আবেদনকারীর পরিবারের মোট জমির পরিমাণ সম্পর্কে তহসিলদারকে অবহিত হতে হবে এবং তার পরিবারের মোট জমির সাথে নামজারির আবেদন বা নামজারি মামলায় উল্লিখিত জমি সংযুক্ত হলে যদি তা ১৯৫০ সনের জমিদারী অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯০ ধারা অথবা রাষ্ট্রপতির ১৯৭২ সনের ৯৮ নং আদেশ বা ১৯৮৪ সনের ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশের বিধানমতে উক্ত পরিবারের সংরক্ষণযোগ্য জমির পরিমাণ অপেক্ষা বেশি হয় তবে তার জন্য নামজারির প্রস্তাব দেওয়া যাবে না।

বরং অনুরূপক্ষেত্রে এরূপ সীমাভিত্তিক জমির জন্য একটি পৃথক বাজেয়াপ্ত মামলা দায়ের করার প্রস্তাব দিতে হবে এবং উক্ত নামজারি মামলা উল্লিখিত কারণে খারিজের প্রস্তাব দিতে হবে। বর্ণিত অবস্থায় আইনের বিধান অনুযায়ী উক্ত মালিক বা পরিবার প্রধানকে তার সংরক্ষণ ক্ষমতার ভিতর কোন কোন জমি তিনি রাখতে চান তা যথাযথভাবে শুনানি দিয়ে উক্ত নামজারি মামলা এবং বাজেয়াপ্ত মামলার একই সাথে আদেশ প্রদান করতে হবে।

উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমির জন্য নামজারি মামলার ক্ষেত্রে যিনি নামজারির আবেদন করছেন তার পূর্বের জমি এবং নামজারি দরখাস্তে উল্লিখিত জমি একত্র করলে তা যদি ১৯৮৪ সনের ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশে উল্লিখিত সংরক্ষণ সীমার অতিরিক্ত হয়ে যায় তবে সীমাতিরিক্ত জমির জন্য নামজারির প্রস্তাব প্রদান করা যাবে না। এরূপ ক্ষেত্রে তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমি হতে কোন উন্নত জমি নিয়ে পূর্বের কোন অনুন্নত জমি সমর্পণ করবেন কিনা তদমর্মে শুনানির সুযোগ দিয়ে নামজারির প্রস্তাব প্রেরণ করতে হবে।

উপরোক্ত বিষয়াদী পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যদি সংশ্লিষ্ট জমি নামজারি করার উপযোগী হয় তবে তহসিলদার ভূমি হস্তান্তর নোটিসমূলে পূর্বে নামজারি মামলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফরম নং- ১০৭৯ এ বর্ণিত কলামসমূহ ও অন্যান্য বিষয়ে যথারীতি পূরণ করে তার মতামতসহ নামজারী প্রস্তাব প্রস্তুত করবেন। জমা ভাগ ও জমা একত্রীকরণের ক্ষেত্রে তিনি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রস্তাবের সাথে ট্রেস ম্যাপ সংযুক্ত করবেন।

তহসিলদার কর্তৃক মতামত লিপিবদ্ধ করার সময় তিনি প্রস্তাবিত জমি অর্পিত ও পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত কিনা ভূমি উন্নয়ন কর বা অন্য কোন ঋণের দায়ে নিলাম বিক্রীত কিনা বা সার্টিফিকেট মামলায় আওতাভুক্ত কিনা ভূমি উন্নয়ন কর হাল নাগাদ পরিশোধিত আছে কিনা এবং নামজারিতে কারো কোন আপত্তি আছে কিনা ইত্যাদি বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করবেন ।

কিন্তু উপরোক্ত বিষয়াদি পর্যালোচনা অন্তে যদি প্রতীয়মান হয় যে, নামজারি মামলায় উল্লিখিত নামজারি করার উপযোগী নয়, তবে তিনি তার বিশদ কারণ ব্যাখ্যা করে নামজারি আবেদন বাতিল বা মামলা খারিজের প্রস্তাব প্রস্তুত করবেন।

 

জমির নামজারি (Mutation)

 

(ঙ) নামজারির প্রস্তাব প্রেরণঃ

নামজারির প্রস্তাব বা নামজারি মামলা খারিজের প্রস্তাব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর তহসিলদার তা নামজারি মামলার নথির সাথে সংযুক্ত করবেন। প্রচলিত খতিয়ানের অনুলিপি এবং দরকারমত আবেদনকারী কর্তৃক দায়েরকৃত মূল রেজিস্ট্রি দলিল বা তার সত্যায়িত ফটোকপি ও উত্তরাধিকারের সনদপত্র মামলার নথির সাথে যুক্ত করা বাঞ্ছনীয়। নামজারি মামলার কেইস নথির আদেশপত্রের ৩য় কলামে প্রস্তাব প্রস্তুতি ও নথির সাথে সংযুক্তির বিষয়টি সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করতে হবে।

এরপর নথিটি পুনরায় সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নিকট ফেরৎ পাঠাতে হবে। সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নিকট ফেরৎ পাঠানোর সময় তা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে রক্ষিত নামজারি রেজিস্টার (রেজিস্টার (LIX)-এর ৭ নং কলামে লিপিবদ্ধ করে কেইস মুভমেন্ট রেজিস্টারে যথারীতি নোট করে বিশেষ কর্তৃপক্ষ মারফত প্রেরণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই প্রস্তাব প্রেরণের বিষয়টির প্রতি প্রত্যেক তহসিলদারকে খেয়াল রাখতে হবে।

(চ) নামজারির প্রস্তাব প্রাপ্তিঃ

ইউনিয়ন ভূমি অফিস হতে তহসিলদারের প্রস্তাবসহ নথি ফেরৎ পাওয়ার পর থানা ভূমি অফিসের নামজারি সহকারী তা নামজারি রেজিস্টারের নির্ধারিত কলামে লিপিবদ্ধ করবেন এবং নির্ধারিত তারিখে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নিকট পরবর্তী আদেশের জন্য উপস্থাপন করবেন।

(ছ) পরবর্তী শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ ও নোটিস প্রদানঃ

তহসিলদার কর্তৃক প্রদত্ত নামজারি প্রস্তাব বা নামজারি বাতিল প্রস্তাবসহ থানা ভূমি অফিসের নামজারি সহকারী বা পেশকার নথিটি সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নিকট উপস্থাপন করলে তিনি তহসিলদারের প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে দেখবেন। 

সংশ্লিষ্ট তহসিলদারের প্রস্তাবে যদি নামজারি বাতিলের সুপারিশ প্রদান করা হয়ে থাকে তবে যার বা যাদের অনুকূলে নামজারির জন্য সংশ্লিষ্ট কেইসটি দায়ের করা হয়েছিল তাকে বা তাদেরকে নোটিশ দিয়ে শুনানী গ্রহণ করতে হবে।

পক্ষান্তরে যদি নামজারি প্রস্তাবে নামজারি ও জমাভাগ মঞ্জুর বা অনুমোদনের সুপারিশ করা হয় তবে মামলার সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নোটিস দিয়ে শুনানি গ্রহণ করতে হবে। এখানে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ বলতে বাদীপক্ষ অর্থাৎ যার বা যাদের অনুকূলে নামজারি মঞ্জুর করা হবে এবং বিবাদীপক্ষ অর্থাৎ যে খতিয়ানে নামজারি করা হবে সে খতিয়ানের রেকর্ডীয় মালিক বা মালিকগণকে বুঝাবে।

বাদী ও বিবাদীর প্রতি যাতে সময়মত নোটিশ প্রেরণ করা হয় সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। এরূপ ক্ষেত্রে নোটিশ ইস্যুর তারিখ হতে অন্ততপক্ষে ৭ দিন পরে শুনানির তারিখ ধার্য করতে হবে। নোটিশ জারীর সময় যাতে বাদী বিবাদী অথবা তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি বা তাদের পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের নিকট যথানিয়মে নোটিস জারী হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

লটকিয়ে নোটিস জারীর ক্ষেত্রে প্রসেস সার্ভেয়ারকে স্থানীয় মেম্বার বা ওয়ার্ড কমিশনার বা চৌকিদার বা অন্য কোন স্থানীয় দায়িত্বশীল দু’জন ব্যক্তিকে সাক্ষী রেখে তা জারী করতে হবে। নোটিস জারী করার পর জারীকারক যে প্রতিবেদন দাখিল করে তাতে নাজির বা তহসিলদার কর্তৃক প্রত্যয়ন বা প্রতিস্বাক্ষর থাকা আবশ্যক। নোটিশ জারী সংক্রান্ত প্রতিবেদন শুনানির নির্ধারিত তারিখের পূর্বেই সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নিকট উপস্থাপন করা আবশ্যক।

(জ) মামলার শুনানী গ্রহণঃ

নামজারি মামলার শুনানীর জন্য নির্ধারিত তারিখে সংশ্লিষ্ট নামজারি সহকারী বা পেশকার পক্ষগণের হাজিরাসহ কেইসের নথি সংশ্লিষ্ট আদালতে উপস্থাপন করবেন। যে কোন পক্ষের সময়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে ন্যায় বিচারের সার্থে শুনানি স্থগিত রেখে পরবর্তী শুনানীর তারিখ নির্ধারণের ক্ষমতা আদালতের রয়েছে। শুনানির দিন কোন পক্ষ আদালতে অনুপস্থিত থাকলে আদালত দরকার মনে করলে পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করতে পারবেন বা একতরফাভাবে মামলার শুনানি গ্রহণ করে রায় ঘোষণা করতে পারবেন। শুনানির জন্য নির্ধারিত তারিখে রায় ঘোষণা না করে আদালত ইচ্ছা করলে পরবর্তী কোন সুবিধাজনক তারিখে মামলার রায় ঘোষণা করতে পারেন।

শুনানীকালে আদালত পক্ষগণের মূল দলিলপত্র ও রেকর্ডাদি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে দেখবেন। পক্ষগণের আপত্তি বা যুক্তিতর্ক তিনি মনোযোগের সাথে শ্রবণ করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করবেন। রেকর্ড কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনাকালে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি আদালত সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন:

(১) রেজিস্টার্ড দলিলঃ

কোন পক্ষ কর্তৃক দলিল দাখিল করা হয়ে থাকলে উরু দলিল ১৯০৮ সনের রেজিস্ট্রেশন আইনের বিধানমতে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে কিনা তা দেখতে হবে। যে প্রচলিত রেকর্ডে নামজারি করা হবে সে রেকর্ড প্রস্তুতিকালের পরবর্তী সময়ে সম্পাদিত দলিল কিনা তা ভালভাবে দেখতে হবে। যদি উক্ত দলিল রেকর্ড বা খতিয়ান প্রস্তুতকালে পূর্ববর্তী সময়ের দলিল হয় তবে তার দ্বারা প্রচলিত খতিয়ান সংশোধন করা বিধিসম্মত নয়।

একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি পরিষ্কার করা যেতে পারে। যদি কোন আবেদনকারী ১৯৬২ সনে চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত এস, এ খতিয়ানে নামজারির জন্য ১৯৫০ সনের রেজিস্টার্ড দলিল উত্থাপন করেন তবে উক্ত দলিল অনুযায়ী উক্ত নামজারি মঞ্জুর করা আইনসম্মত হবে না। কারণ উক্ত ১৯৫০ সনের রেজিস্টার্ড দলিলমূলে প্রাপ্ত সম্পত্তির মালিকানা ১৯৬২ সনের এস. এ. খতিয়ানে প্রতিফলিত হওয়া উচিত ছিল।

তার মানে ১৯৫০ সনের দলিলমূলে প্রাপ্ত মালিকের নামে সংশ্লিষ্ট জমির এস, এ খতিয়ান সৃষ্ট হওয়া উচিত ছিল। এক্ষেত্রে বিষয়টি নামজারি আদালতের এখতিয়ার বহির্ভূত। এটি দেওয়ান আদালতের এখতিয়ারভুক্ত এবং Bonafide ত্রুটিজনিত কারণে রেকর্ড সংশোধনী কার্যক্রমের আওতাভুক্ত।

(২) বিক্রেতার মালিকানা স্বত্ব এবং কি পরিমাণ হস্তান্তর করার অধিকার ছিলঃ

উপস্থাপিত রেজিস্টার্ড দলিল বা দলিলসমূহের বিক্রেতা বা দাতা প্রচলিত রেকর্ডভুক্ত মালিক কিনা বা তাদের বৈধ ওয়ারিশ কিনা এবং বিক্রিত বা হস্তান্তরিত জমি আইনগতভাবে হস্তান্তরের ক্ষমতা তার ছিল কিনা তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। উপস্থাপিত দলিলের দাতা যদি রেকর্ডীয় মালিক হন কিন্তু তিনি যদি হস্তান্তরের অধিকারসম্পন্ন পরিমাণ সম্পত্তির চেয়ে বেশি পরিমাণ সম্পত্তি রেজিস্ট্রিমূলে হস্তান্তর করে থাকেন তবে যে পরিমাণ সম্পত্তি হস্তান্তরের অধিকার উক্ত দাতার ছিল সে পরিমাণ পর্যন্ত সম্পত্তির জন্য নামজারি করা যাবে। দু’টি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে-

(i) রহিম ৪৭ নং খতিয়ানের আট আনা অংশে মোট ৪০ শতক জমির মালিক। উক্ত খতিয়ানে মোট জমির পরিমাণ ৮০ শতক। এখন রহিম যদি ৩০-৭-৭০ইং তারিখের ২৫০ নং দলিলমূলে করিমের নিকট ৩০ শতক জমি বিক্রি করে এবং পরবর্তীতে ৫-২-৭৯ইং তারিখের দলিলমূলে শহিদের নিকট আরও ২০ শতক জমি বিক্রি করে তবে শহিদের অনুকূলে ১০ শতকের চেয়ে বেশি জমির নামজারি করা যাবে না। কারণ অতিরিক্ত ১০ শতক জমি বিক্রির বৈধ অধিকার রেকর্ড অনুযায়ী তার ছিল না।

(II) মনে করি সুমন একটি প্রচলিত খতিয়ানে ০.৯৬ একর জমির মালিক। সুমনের মৃত্যুর পর উক্ত খতিয়ানে ওয়ারিশ সূত্রে নামজারি না করে তার ওয়ারিশ ১ম পুত্র, ২ কন্যা ও স্ত্রীর মধ্যে পুত্র ৫০ শতাংশ জমি জনৈক রহিমের নিকট বিক্রি করে। এক্ষেত্রে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনমতে পুত্র ৪২ শতাংশ জমির বৈধ মালিক এবং উক্ত রহিমের নিকট ৪২ শতকের অতিরিক্ত ৮ শতক জমির জন্য তার অনুকূলে নামজারি অনুমোদন করা আইনসঙ্গত হবে না। উক্ত রহিমের অনুকূলে ৪২ শতক জমির জন্য নামজারির আবেদন অনুমোদন করতে হলেও ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষের উত্তরাধিকার সনদপত্র প্রয়োজন হবে।

(৩) দখল সংক্রান্ত বিষয়ঃ

তহসিলদার বা তার সহকারী কর্তৃক প্রদত্ত সরেজমিনে প্রতিবেদনে মামলার আওতাভুক্ত জমির দখল সম্পর্কে সুস্পষ্ট মতামত দেওয়া হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। বাদীপক্ষ যে খতিয়ান বা দাগে যতটুকু জমির বৈধভাবে হস্তান্তর প্রাপ্তির দাবিদার সে খতিয়ানে বা দাগে ততটুকু জমির শান্তিপূর্ণ দখলে আছে কিনা তা স্পষ্টভাবে তহসিলদারের বা তার সহকারীর সরেজমিনে তদন্ত প্রতিবেদনের উল্লেখ থাকতে হবে।

নামজারি র ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জমির দখল প্রাপ্তি একটি অন্যতম পূর্বশর্ত। কাজেই বাদীপক্ষ যতটুকু জমির দখলপ্রাপ্ত হয়েছে তার চেয়ে বেশি জমির জন্য নামজারি অনুমোদন করা যাবে না। তবে ক্রেতা আপোসরফা মতে বিক্রেতার অন্য দাগের কোন জমিতে দখলে থাকলে এবং দলিলে উল্লিখিত থাকলে সেক্ষেত্রে তা উল্লেখপূর্বক নামজারি অনুমোদন করা যাবে।

(৪) সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনের আওতায় নামজারির প্রতিবন্ধকতাঃ

এরপর সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে দেখতে হবে যে, সংশ্লিষ্ট নামজারি বর্তমানে বলবৎ অন্য কোন আইনে বারিত কিনা।

মামলাভুক্ত জমি অন্য কোন দেওয়ানী আদালতে পেণ্ডিং মামলায় নামজারি বা অন্যান্য কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা দ্বারা বারিত কিনা, মামলাভুক্ত জমি ১৯১৩ সনের সরকারি পাওনা আদায় আইনের অধীনে সার্টিফিকেট মামলার অন্তর্ভুক্ত কিনা, এটি অর্পিত বা পরিত্যক্ত সম্পত্তি কিনা, রাষ্ট্রপতির ১৯৭২ সনের ৯৮ নং আদেশের আওতায় এবং ১৯৮৪ সনের ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশের বিধান মতে বা ১৯৮৭ সনের ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশের আওতায় প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে খাস জমি বণ্টন নীতিমালার আওতায় নামজারিতে কোন প্রকারের প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা এবং উপরোক্ত বিষয়ে অন্যান্য সরকারি নির্দেশ বা আইনের আওতায় নামজারিকরণে প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা ইত্যাদি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে।

(৫) তহসিলদার কর্তৃক প্রেরিত প্রতিবেদন পর্যালোচনাঃ

মামলার রায় প্রদানের পূর্বে নির্ধারিত ফরমে তহসিলদার কর্তৃক প্রদত্ত প্রতিবেদনের সাথে উপস্থাপিত কাগজপত্র ও দলিলাদি পরীক্ষা করে দেখতে হবে। তহসিলদারের প্রতিবেদন ফরমের (ফরম নং- ১০৭৯) ১ নং কলামে বাদীপক্ষের নাম, পিতার নাম, ঠিকানা এবং প্রত্যেকের অংশ সঠিকভাবে বিবৃত হতে হবে। উক্ত ফরমের ২ নং কলামে শুধু হোল্ডিং নাম্বার লিখার ব্যবস্থা থাকলেও তাতে হোল্ডিং নাম্বারের নিচে সংশ্লিষ্ট প্রচলিত খতিয়ান নাম্বারও উল্লেখ করতে হবে।

প্রচলিত খতিয়ানের রেকর্ডীয় মালিকগণের নাম, পিতার নাম, ঠিকানা এবং খতিয়ান অনুযায়ী প্রত্যেকের অংশ খতিয়ানে মোট জমি ভূমি উন্নয়ন করের পরিমাণ সঠিকভাবে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। ৩ নং কলামের দাগের নম্বর উপ-কলামে নামজারির জন্য প্রস্তাবিত দাগের নাম্বার বর্ণনা উপ-কলামে প্রস্তাবিত দাগের মোট জমির পরিমাণ ও শ্রেণী এবং জমির পরিমাণ, এবং উক্ত কলামের শেষ উপ- কলামে প্রস্তাবিত ভূমি উন্নয়ন করের পরিমাণ সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কিনা তা পর্যালোচনা করতে হবে।

সর্বশেষ তহসিলদার কর্তৃক প্রেরিত ফরমের ২য় পৃষ্ঠায় বর্ণিত সমস্ত প্রশ্নাবলীর যথাযথ ও সঠিক উত্তর এবং অর্পিত বা পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্তি সাঃ মামলা ও দেওয়ানী মামলা ভুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে প্রত্যয়নসহ তহসিলদারের মতামত বিধৃত হয়েছে কিনা তা পর্যালোচনা করে দেখতে হবে ।

 

(ঝ) রায় ঘোষণাঃ

নামজারি জমাভাগ বা জমা একত্রীকরণ কার্যক্রম একটি বিচার বিভাগীয় কার্যক্রম। সুতরাং এর সমাপ্তি ঘটবে রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে। নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে এই কার্যক্রমের রেকর্ডানি, দলিলাদি এবং তহসিলদারের প্রতিবেদন বা প্রস্তাব এবং বাদী বিবাদীর প্রস্তাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে চূড়ান্ত আদেশ বা সিদ্ধান্ত প্রদানই হলো রায়। রায় লিখিত এবং প্রদানকারী আদালত কর্তৃক তারিখ উল্লেখপূর্বক স্বাক্ষরিত হতে হবে।

এতে রায়ের কারণ যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। এবং পর্যাপ্ত তথ্যাদি সন্নিবেশিত করতে হবে যাতে প্রয়োজনে আপীল আদালত বা রিভিউ আদালত সহজেই অনুধাবন করতে পারে যে কোন অবস্থার প্রেক্ষিতে এবং কি কারণে অনুরূপ সিদ্ধান্ত বা রায় প্রদান করা হয়েছে রায়ের ভাষা সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল হতে হবে। রায় দুর্বোধ্য না হয়ে সহজবোধ্য হতে হবে যাতে তামিলকারী কর্তৃপক্ষ সহজেই অনুধাবন করতে পারে এবং যথাযথভাবে রায় তামিল করতে পারে।

একটি রায়ে নিম্নলিখিত বিষয়াবলী সন্নিবেশিত হওয়া আবশ্যক

(i) বাদীপক্ষের প্রার্থিত প্রতিকার; 

(II) বাদীপক্ষের উপস্থাপিত বক্তব্য;

(III) বিবাদীপক্ষের উপস্থাপিত বক্তব্য,

(iv) তহসিলদারের প্রতিবেদন রেকর্ডপত্র ও দলিলাদির সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা,

(v) সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা;

(vi) সিদ্ধান্ত, এবং

(vii) সিদ্ধান্ত তামিলের নির্দেশ।

রায় প্রদানের পর এতে স্বাক্ষর দেওয়া হয়ে গেলে করণিক ত্রুটি সংশোধন ব্যতীত অন্যকোন প্রকার সংশোধন করার ক্ষমতা রায় প্রদানকারীর থাকে না। তবে রায় প্রয়োগের পর তাতে মারাত্মক ভুল পরিলক্ষিত হলে তা রায় প্রদানকারী আদালত ১৯৫০ সনের অমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৫০ ধারানুযায়ী পুনর্বিচার (Review) করতে পারেন। নামজারি মামলার রায় যাতে যথাযথভাবে এবং সময়মত কার্যকরী করা যায় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।

 

জমির নামজারি (Mutation)
জমির নামজারি (Mutation)

 

(ঞ) রায় নামজারি রেজিস্টারে লিপিবদ্ধকরণঃ

রায় প্রদানের পর তা থানা ভূমি অফিসের নামজারি রেজিস্টার (রেজিস্টার IX) এর ৮ নং কলামে রায় প্রদানের তারিখ এবং ৯ নং কলামে রায়ের সারমর্ম লিপিবদ্ধ করে তাতে রায় প্রদানকারী আদালতের স্বাক্ষর প্রদান করতে হবে। এরপর উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপীল বা রিভিউ করার ৩০ দিন সময়সীমার মধ্যে যদি কোন পক্ষ আপীল বা রিভিউ না করে তবে ৩০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর আদেশ তামিলের জন্য সংশ্লিষ্ট তহসিলদারের নিকট প্রেরণ করতে হবে।

রায়ের বিরুদ্ধে আপীল, রিভিশন বা রিভিউ হতে পারে। অতএব যদি আপীল, রিভিউ বা রিভিশন করার সময়সীমা পর্যন্ত অপেক্ষা না করে রেকর্ড সংশোধন করা হয় তবে আপীল, রিভিউ বা রিভিশনের রায়ের পর তা পুনরায় সংশোধন করতে হবে। ফলে রায় বার বার কাটা ছেড়ার ফলে রেকর্ডের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

(ট) ইউনিয়ন ভূমি অফিসের রেকর্ড/ রেজিষ্টার সংশোধনঃ

রায় ঘোষণার পর রায় তামিলের জন্য ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কেইস নথি প্রাপ্তির পর তহসিলদার তার অফিসে সংরক্ষিত রেজিস্টারের ৮, ৯, ১০ ও ১১ নং কলামের, বর্ণনামতে তাতে নোট করবেন এবং নামজারি প্রস্তাব অনুমোদিত হলে অনুমোদন মোতাবেক ১ নং রেজিস্টার (খতিয়ান বা স্বত্বলিপি বহি) এবং ২ নং রেজিস্টার (তলববাকী রেজিস্টার)-এ যথাযথভাবে তা লিপিবদ্ধ করবেন। তারপর তিনি সত্যায়নকারী কর্মকর্তার স্বাক্ষর গ্রহণ করবেন।

এসব রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করার সময় রায়ের আদেশাংশের সারমর্ম সংক্ষেপে এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবে বিষয়টি যাতে লিপিবদ্ধ করা হয় তার প্রতি বিশেষ যত্নবান হতে হবে। এরূপ আদেশ কার্যকরী করার পর সংক্ষিপ্ত কার্যকরী প্রতিবেদনসহ নথিটি অবিলম্বে থানা ভূমি অফিসে ফেরৎ পাঠাতে হবে। তহসিলদারের প্রতিবেদন ফরমের (ফরম নং- ১০৭৮ বা ১০৭৯) ২ কপির মধ্যে এক কপি তার নিজ অফিসের গার্ড ফাইলে সংরক্ষণ করতে হবে। 

(ঠ) থানা ভূমি অফিসের রেকর্ড/স্বত্বলিপি বা খতিয়ান সংশোধনঃ

পূর্বোক্ত অনচ্ছেন মতে কার্যকরীকরণ প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট নামজারি মামলার কেইস নথি থানা ভূমি অফিসে ফেরৎ আসার পর থানা ভূমি অফিসে রক্ষিত রেজিস্টার ও রায় মোতাবেক প্রয়োজনীয় সংশোধন করার পর যথারীতি প্রত্যয়ন স্বাক্ষর গ্রহণ করতে হবে এবং সাথে সাথে নামজারি রেজিস্টার LX-এর ১০ এবং ১১ নং কলামও যথাযথভাবে পূরণ ও স্বাক্ষরিত হতে হবে। থানাভূমি অফিসের রেকর্ড সংশোধনের ক্ষেত্রে রেজিস্টার (1) সংশোধন করার সময় ইউনিয়ন ভূমি অফিসের রেজিস্টার (11) সংশোধনে যে ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, হুবহু সেই ভাষা ও শব্দ ব্যবহার করা উচিত। তাতে উভয় রেকর্ডের সাম্য থাকে।

(ড) নামজারি মামলার কেইস নথি সংরক্ষণঃ

উপরে আলোচিত প্রক্রিয়ায় সমস্ত রেকর্ড সংশোধিত হবার পর মামলার পরিসমাপ্তি হয়েছে বলে ধরে নেয়া হবে। অতঃপর উক্ত চূড়ান্ত কেইস নথি থানা ভূমি অফিসে ১২ বছর পর্যন্ত যথানিয়মে সংরক্ষিত করতে হবে। ১২ বছর অস্তে তা যথারীতি নষ্ট করে ফেলতে হবে।

 

দেওয়ানী আদালতের রায় এবং ডিক্রির প্রেক্ষিতে খতিয়ান / স্বত্বলিপি সংরক্ষণঃ

১৯৫০ সনের জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইনের আওতায় সরকার কর্তৃক সকল জমিদারী অধিগ্রহণের কাজ সমাপ্ত হওয়ায় (কতিপয় বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যতীত) উক্ত আইনের ১ম খণ্ড হতে ৪র্থ খণ্ডের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়। ফলে উক্ত আইনের ৫৪ ধারার আওতায় দেওয়ানী আদালতের রায় এবং ডিক্রিমূলে খতিয়ান বা স্বত্বলিপি সংশোধনের ক্ষমতা প্রয়োগের আর কোন প্রকার অবকাশ থাকে না।

এমতাবস্থায় দেওয়ানী আদালতের রায় বা ডিক্রিমূলে খতিয়ান সংশোধন বা পরিবর্তনের বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। এ মতবিরোধ নিরসনকল্পে তদানিন্তন ভূমি প্রশাসন বোর্ডের স্মারক নং ১ (১৯) ১০-৪৬/৮৩ বি এল এ তারিখ ৫-১-১৯৮৪ইং মূলে বোর্ডের চেয়ারম্যান দেওয়ানী আদালতের রায় এবং ডিক্রির প্রেক্ষিতে রেকর্ড সংশোধন ও স্বত্বলিপি/খতিয়ান সংরক্ষণ বিষয়ে নিম্নোক্ত মতামত ব্যক্ত করেন ।

১৯৫০ সনের জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৫ম খণ্ড সমগ্র বাংলাদেশে বলবৎ হওয়ার পর প্রজাস্বত্ব আইন কার্যকরী হয়েছে এবং উক্ত আইনের ১ম খণ্ড হতে ৪র্থ খণ্ডে বর্ণিত জমিদারী উচ্ছেদ তথা অধিগ্রহণ সংক্রান্ত আইন এখন আর প্রযোজ্য নয় । কেননা জমিদারী উচ্ছেদ তথা অধিগ্রহণ আইনের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। 

১৯৫০ সনের জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৫ম খণ্ডের ১৪৩ ও ১৪৪ ধারা নিম্নোক্ত উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছে

(ক) স্বত্বলিপি/খতিয়ান সংরক্ষণ

(খ) স্বত্বলিপি/খতিয়ান পর্যায়ক্রমে প্রস্তুত ও চূড়ান্তকরণ। 

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রজাস্বত্ব আইন ও বিধিমালার বিধান সাপেক্ষে কবলা, দান, উইল এবং উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ১৯৫০ সনের জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩ ধারার আওতায় স্বত্বলিপি/খতিয়ান সংরক্ষণ, পরিবর্তন বা সংশোধন করা হয়।

এ বিষয়ে কোন দ্বিমত বা সংশয়ের অবকাশ নেই। উক্ত ধারার রুজুকৃত কেইসসমূহ নিষ্পত্তিকরণের সময় জনি হস্তান্তর আইন, প্রজাস্বত্ব আইন ও বিধিসমূহের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি প্রদান করতে হবে। প্রত্যেকটি কেইস নিজস্ব গুণাবলীর ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করতে হবে। কিন্তু দেওয়ানী আদালতের রায় এবং ডিক্রির প্রেক্ষিতে খতিয়ান সংরক্ষণ / পরিবর্তন ও সংশোধনের বিষয়ে বিভিন্ন মহলে যথেষ্ট দ্বিমত বা মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।

এ অবস্থার প্রেক্ষিতে ভূমি প্রশাসন বোর্ড (বর্তমানে ভূমি আপীল বোর্ড)-এর রায় সহ দেওয়ানী আদালতের রায় এবং ডিক্রির প্রেক্ষিতে খতিয়ান সংরক্ষণ ও পরিবর্তন/সংশোধনের বিষয়েও উক্ত আইনের ১৪৩ ধারা প্রয়োগ করতে হবে, উক্ত আদালতসমূহের প্রদত্ত রায় এবং ডিক্রিও দলিল সম্পাদনের সমর্থক বলে গণ্য হবে ।

 

নামজারি দরখাস্ত ও অন্যান্য কাগজ পত্রের নমুনা:

 

নামজারি দরখাস্তের নমুনা :

সহকারী কমিশনার (ভূমি)

থানা ভূমি অফিস

নেত্রকোনা সদর, নেত্রকোনা।

বিষয়ঃ ১৯৫০ সনের জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩ ধারামতে নামজারির আবেদন

আবেদনকারী

(১) মোঃ মক্রম আলী (মাস্টার)

পিতা- মৃত হাকিম উদ্দিন, সাং- কালিয়া, থানা নেত্রকোনা

জনাব,

বিনীত নিবেদন এই যে, আমি নিম্ন তফসিল বর্ণিত জমি প্রচলিত খতিয়ানের রেকর্ডভুক্ত মালিক মোঃ ছালামত, পিতা-মরহুম হাকিম উদ্দিন, সাং- কান্দুলিয়া, থানা নেত্রকোনা হতে নিম্নোক্ত রেজিস্ট্রিকৃত দলিল মূলে প্রাপ্ত হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ভোগ দখলে রত আছি। উল্লিখিত জমি আমার নামে রেকর্ডভুক্তকরণ ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের জন্য নামজারি করা একান্ত আবশ্যক । অতএব, বিনীত প্রার্থনা এই যে, উল্লিখিত খতিয়ানে নিম্নোক্ত জমির জন্য আমাদের নামজারির আদেশদানে বাধিত করবেন।

তফসিল

সিংহের বাংলা ইউনিয়ন ভূমি অফিস, নেত্রকোনা 

মৌজাঃ কান্দুলিয়া

প্রচলিত খতিয়ান নং দাগ নং খরিদকৃত জমি রেজিঃ দলিল নং ও তারিখ
৩২২০

৭২০

৭২১

৭২১

০.২০ একর

০.২৫ একর 

০.৩৫ একর

১১০ তারিখ ১৫-২-৯০ ইং

১৭০ তারিখ ৫-৪-৯০ ইং

মোট                ০.৮০ একর

তারিখ-১২-৭-৯০ইং                                                                                                      বিনীত

 

নামজারি মামলার শুনানী নোটিসের নমুনা

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

থানা ভূমি অফিস

নেত্রকোনা সদর, নেত্রকোনা

 

সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর আদালত

শুনানী নোটিশ

প্রতি

১। মোঃ মক্রম আলী (মাস্টার)

পিতা মৃত হাকিম উদ্দিন

সাং- কান্দুলিয়া, থানা নেত্রকোনা – বাদী পক্ষ।

বনাম

১। মোঃ ছালামত, পিতা- মরহুম সাহেদ আলী

সাং- কান্দুলিয়া, থানা- নেত্রকোনা —-বিবাদী পক্ষ।

সূত্র নামজারি মামলা নং ৫০/১৯৯০-৯১ইং।

এতদ্বারা জানানো যাচ্ছে যে, বাদীপক্ষ তফসিলোক্ত সম্পত্তির নামজারির আবেদন করায় অত্র আদালতে সূত্রে বর্ণিত কেইস রুজু হয়েছে এবং আগামী ২৫/০৮/১৯৯০ইং তারিখ তা শুনানীর জন্য নির্ধারিত হয়েছে।

অতএব, উক্ত নির্ধারিত শুনানীর তারিখে আপনাদেরকে নিজ নিজ দলিলাদি ও রেকর্ড ইত্যাদি সহ হাজির হয়ে পক্ষে/বিপক্ষে আপনাদের আপত্তি বা বক্তব্য পেশ করার জন্য বলা হলো।

অন্যথায় আপনাদের অনুপস্থিতেই বিধিমত কার্যক্রম গৃহীত হবে।

 

তফসিল

মৌজা-কাম্বুলিয়া, ইউনিয়ন ভূমি অফিস- সিংহের বাংলা

প্রচলিত খতিয়ান নং দাগ নং প্রার্থিত জমি  
  ৩২২০

  ৭২০

৭২১

০.২০ একর

০.৬০ একর

রেজিঃ দলিল ১১০ তাং ১৫-২-৯০ ইং 

রেজিঃ দলিল ১৭০ তাং ৫-৪-৯০ ইং

                                                        মোট- ০.৮০ একর

অদ্য ২০-০৮-৯০ ইং আমার স্বাক্ষর ও সীলমোহর মতে জারী করা হলো।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) 

নেত্রকোনা সদর, নেত্রকোনা

 

বাংলাদেশ ফরম নং- ১০৭৯

মহালের কাগজ পরিবর্তনের জন্য দরখাস্ত

অফিসের রেজিস্টারের ১৯৯০-১১

সদর অফিসের রেজিস্টারের ১৯৯০-৯১

 

তৌজি নং ১৭                                  গ্রাম: কান্দুলিয়া                                         থানা নেত্রকোনা

দরখাস্তকারীর বা যে ব্যক্তিকে প্রজা বলে লিখনভুক্ত করতে হবে বলে প্রস্তাব হচ্ছে তার নাম, পিতার নাম ও সাকিন এবং সে যদি এখনই মহালের রায়ত হয় তাহলে খাজনার কাগজে তার নম্বর। দরখাস্ত বা রিপোর্টের দরুন যে প্রজাস্বত্বের ক্ষতি বৃদ্ধি হয় তার বিবরণ
জোতের নম্বর লিখনভুক্ত প্রজার নাম মোট জমির পরিমাণ মোট খাজনা

মোঃ মক্রম আলী

পিতা-মৃত হাকিম উদ্দিন 

সাং- কান্দুলিয়া

থানা নেত্রকোনা

নেত্রকোনা

৩২২০ মোঃ ছালামত 

পিতা মরহুম সাহেদ আলী 

সাং- দেবীপুর

২.১৪

৬৪.২০

 

ক) ২ ও ৩ ঘরের বিবরণগুলো নির্ভুল কিনা? – হ্যাঁ

খ) দরখাস্তকারীর প্রস্তাবিত জমিতে দখল আছে কিনা? – হ্যাঁ

গ) দরখাস্তকারীর শরীক আছে কিনা এবং থাকলে তাদের নাম ও ঠিকানা

প্রযোজ্য নয়।

ঘ) কোন ব্যক্তির কোন আপত্তি আছে কিনা এবং থাকলে তার বিবরণ তদন্তকালে জনৈক আঃ কালাম, পিতা-আঃ রহিম কর্তৃক দেয়া হয়। তিনি এস. এ. রেকর্ডীয় মালিক হতে উক্ত জমি খরিদ করেছেন বলে জানান; কিন্তু তিনি দখল পাননি। তার আপত্তি গ্রহণযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়নি।

ঙ) দলিলপত্র উপস্থিত করা হলে তার বিবরণ রেজি: দলিল নং ১২০, তারিখ ২২/২/৯০ ইং রেজিস্ট্রি দলিল নং ১৯০, তারিখ ৫/৩/৯০ এর ফটোকপি দাখিল করা হয়েছে, মূল দলিল দেখেছি।

 

জমির নামজারি (Mutation)
জমির নামজারি (Mutation)

 

নামজারি বা রিপোর্টের ফরম

সালের ৩০ নং কেইস। 

সালের ৬০ নং কেইস 

মহালঃ কাদুলিয়া

যে জমি সম্বন্ধে খারিজ দাখিলের প্রস্তাব হয়েছে তার বিবরণ যে রকমের খারিজ দাখিলের প্রস্তাব হয়েছে তা-যথা ওয়ারিশ, বিক্রয়, নতুন বন্দোবস্ত জমি সংশোধিত শেণী | বিভাগ ইত্যাদি। মন্তব্য
দাগের নম্বর বর্ণনা জমির পরিমাণ প্রস্তাবিত খাজনা

৭২০

৭২১

শ্রেণী লাল- ১.০০

শ্রেণী লাল- ১.০০

০.২০

.৬০

ভূঃ উঃ কর ৪০.০০ টাকা (আবেদনকারীর পরিবারের জমির পরিমাণ প্রস্তাবিত জমিসহ মোট ৫.৫০একর বিধায়) বিক্রয় সূত্রে রেজিঃ দলিল ১২০ তারিখ ২২/২/৯০ইং রেজিঃ দলিল ১৯০ তাং ৫/৩/৯০ ইং  প্রত্যয়ন করা যাচ্ছে যে, প্রস্তাবিত জমি অর্পিত, পরিত্যক্ত বা খাস জমি নয় এবং নামজারিতে কোন প্রকার নিষেধাজ্ঞা নেই।

 

চ) দরখাস্ত যদি কোন জোতের খাজনা বিভাগ বাবদ হয় তাহলে খাজনা ভাগ করার প্রস্তাব সম্বন্ধে কৈফিয়ত

প্রযোজ্য নহে।

ছ) এ জমি আর কোন জোতের সঙ্গে একত্র করা যায় কিনা? না

জ) বকেয়া বাকি আছে কিনা? না

ঝ) কত হস্তান্তর ফি প্রস্তাব করা হচ্ছে? প্রযোজ্য নহে।

ঞ) কত খাজনা প্রস্তাব করা হচ্ছে এবং কেন? ৪০.০০ টাকা

ভূমি উন্নয়ন কর প্রস্তাব করা হয়েছে। কারণ আবেদনকারী পরিবারের জমির পরিমাণ প্রস্তাবিত জমিসহ ৫ ৫০ একর।

অতএব, উপরোক্ত বর্ণনার আলোকে দরখাস্তকারীগণের অনকূলে ৩নং কলামে উল্লিখিত প্রজার নামের সামিল নামজারির প্রস্তাব করা হলো।

স্বাক্ষর – 

তহসিলদার

ইউনিয়ন ভূমি অফিস, সিংহের বাংলা।

ভূমি হস্তান্তর নোটিস মূলে নামজারি তদন্ত প্রতিবেদন

(৩১৭ অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য)

নামজারি কেইস নং………………… প্রতিবেদন

১. প্রজাস্বত্বের প্রকৃতি, জমির পরিমাণ এবং রাজস্ব/ভূঃউঃকর সঠিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে কিনা?

২. হস্তান্তরকারী জমির দখলে আছেন কিনা এবং ভূমি মালিক হিসাবে খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত আছেন কিনা?

৩. ক্রেতা জমির দখল পেয়েছেন কিনা?

  1. হস্তান্তরিত জমি অবিভক্ত জোতের অংশ কিনা? অথবা পৃথক প্লটভুক্ত অংশ হস্তান্তরিত হয়ে থাকলে দাগ নম্বর উল্লেখ করতে হবে।

৫. এজমালী বা অবিভক্ত জোতের অংশ হস্তান্তরিত হয়েছে কিনা, হয়ে থাকলে গ্রহীতা জমা পৃথক করতে চান কিনা, জমা পৃথকীকরণ করতে চাইলে প্রদেয় রাজস্ব/ভূঃ উঃ কর পৃথকভাবে নির্ধারণ করতে কোন আইনগত বাধা আছে কিনা?

৬. এই জমি অন্য জোতের জমির সাথে একত্রীভূত করা যায় কিনা ?

৭. এই জমির রাজস্ব/ভূঃউঃ কর বকেয়া আছে কিনা এবং থাকলে সার্টিফিকেট মামলা চালু আছে কিনা?

তহসিলদারের স্বাক্ষর

তহসিল…

থানা

তারিখ,

 

একটি নামজারি মামলার আদেশপত্রের নমুনা

বাংলাদেশ ফরম নং- ২৭০

আদেশ পত্র

(১৯১৭ সালের রেকর্ড ম্যানুয়ালের ১২৯ নং বিধি )

 

আদেশপত্র তারিখ                                      হতে                     পর্যন্ত

জেলা- নেত্রকোনা, ১৯৯০-৯১ সালের ৫০ নং মামলা।

মামলার ধরনঃ নামজারি ।

আদেশ ক্রমিক নং ও তারিখ

আদেশ ও অফিসারের স্বাক্ষর

আদেশের উপর গৃহীত ব্যবস্থা
১/ ১০-৭-৯০

আবেদনকারী জনাব (১) মোঃ মক্রম আলী মাস্টার, সাং- কান্দুলিয়া, থানা নেত্রকোনা নির্ধারিত কোর্ট ফি যোগে নিম্ন তফসিলের জমির নামজারির আবেদ করায় অত্র মামলা রুজু করা হল ।

তফসিল

মৌজাঃ কান্দুলিয়া,থানাঃ নেত্রকোনা

প্রচলিত খতিয়ান নং দাগ নং প্রার্থিত জমি
৩২২০ ৭২০ ০.২০ একর
৭২১ ০.৬০ একর
মোট- ০.৮০ একর

তহসিলদার, ইউনিয়ন, ভূমি অফিস, নেত্রকোনা সরেজমিনে তদন্ত ও রেকর্ডাদি পর্যালোচনা করতঃ বিস্তারিত প্রতিবেদন আগামী তারিখের মধ্যে দাখিল করার জন্য বলা হোক। আগামী তারিখ ১২-৮-৯০ ইং ।

স্বাক্ষরিত

সহকারী কমিশনার (ভূমি) 

নেত্রকোনা সদর, নেত্রকোনা