আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়ঃ তামাদি আইন

তামাদি আইন
অন্যান্য আইনের মত ভাগ-বাটোয়ারার মামলার ক্ষেত্রেও তামাদি আইন প্রযোজ্য। সর্বাধিক প্রযোজ্য অনুচ্ছেদসমূহ
আর্টিকেল ১১(ক), ৯১, ১১৩, ১২০, ১২৭, ১৪৪, ১৮২
(১) আর্টিকেল ১১ (ক)ঃ
এতে বলা হয়েছে যে, কোন স্থাবর সম্পত্তির দখলের জন্য ডিক্রীপ্রাপ্ত ব্যক্তি অথবা ডিক্রীজারীতে অনুরূপ সম্পত্তির ক্রেতা যদি উক্ত সম্পত্তির দখল অর্পণে বাধাদান বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগ করে দরখাস্ত করে কিংবা ডিক্রীদার বা ক্রেতাকে সম্পত্তির দখল অর্পণের দরুন যে ব্যক্তি সম্পত্তি হতে বেদখল হয়, যে ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট সম্পত্তিতে অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবীতে যদি কোন দরখাস্ত করে এবং অনুরূপ দরখাস্তের ফলে ১৯০৮ সালের দেওয়ানী কার্যবিধি অনুসারে সেই ব্যক্তির উপর কোন আদেশজারী হয়, সেই ব্যক্তি কর্তৃক আনীত মামলা আদেশদানের এক বছরের মধ্যে করতে হবে।দেওয়ানী কার্যবিধি ২১ আদেশের বিধি ১০৩ প্রযোজ্য। মোকদ্দমা কেবল স্বত্ত্বের, দখলেরই মামলা হবে না।
(২) আর্টিকেল ৯১ঃ
১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারায় দলিল বাতিলের বিধান বর্ণিত হয়েছে কেবল সেক্ষেত্রে এ আর্টিকেলটি প্রযোজ্য। নাবালকের কোন বাটোয়ারা দলিল বাতিলের ক্ষেত্রে আর্টিকেল ৯১ বা ৯৫ টি প্রযোজ্য ।
(৩) আর্টিকেল ১১৩ঃ
চুক্তি প্রবলের জন্য নির্ধারিত তারিখ অথবা অনুরূপ কোন তারিখ নির্দিষ্ট না থাকে, তখন চুক্তি পালনে অস্বীকৃতির বিষয় বাদী যখন অবগত হয়, তা থেকে তিন বৎসরের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হয়। সরল বিশ্বাসে বাটোয়ারা দলিলে যদি কোন বৈষম্য পরিলক্ষিত হয় তবে তা দলিল হিসাবে নয়, চুক্তি হিসাবে গণ্য হবে বিধায় অনুচ্ছেদ ১২০ বা ১৪৪ নয়, অনুচ্ছেদ ১১৩ প্রযোজ্য হবে (১৫৬ আই. সি. ৮৭৯ মাদ্রাজ)। ১৮৯৮ সালের ফৌজদারী কার্যবিধি আইন অনুসারে স্থাবর সম্পত্তির দখলের ক্ষেত্রে তিন বৎসরের মধ্যে মামলা রুজু করতে হবে ।
(৪) অনুচ্ছেদ ১২০ঃ
এ অনুচ্ছেদ অনুসারে তামাদির মেয়াদ সম্পর্কে অব তফসিলের অন্য কোথাও কোন বিধান নেই, সেই মামলার মেয়াদ গণনা করা যাবে। মামলা করার অধিকার যখন সৃষ্টি হয় তখন থেকে ছয় বৎসরের মধ্যে তামাদি গণনা করা হয়।

(৫) অনুচ্ছেদ ১২৭ঃ
যৌথ পরিবারের সম্পত্তির অংশ হতে বহির্ভূত ব্যক্তি কর্তৃক তার অধিকার বলবৎ করার জন্য বাদী যখন বহির্ভূত হয় তখন হতে বার বৎসরের মধ্যে মামলা রুজু করতে হবে। এ অনুচ্ছেদ কোন বহিরাগতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যৌথ সম্পত্তির সহ-মালিককে বুঝানো হয়েছে। যৌথ সম্পত্তির কোন সহ-মালিক দখলচ্যুত হলে সেক্ষেত্রে অত্র অনুচ্ছেদ কার্যকর হয়। আংশিক বাটোয়ারার ক্ষেত্রেও এ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে। দীর্ঘকাল যাবৎ কোন যৌথ সম্পত্তির সদস্য অনুপস্থিত থাকলে তার স্বত্ব নষ্ট হবে না। যখন বহির্ভূত জানা যাবে তখন থেকে অত্র অনুচ্ছেদের তামাদি গণনা হবে।
(৬) তামাদি আইনের অনুচ্ছেদ ১৪৪ঃ
তামাদি আইনের ১৪৪ নং অনুচ্ছেদ বা আর্টিকেলে বলা হয়েছে যে, স্থাবর সম্পত্তি বা তৎসংশ্লিষ্ট কোন স্বত্ত্বের দখল লাভের জন্য অত্র অনুচ্ছেদ মোতাবেক বার বছরের মধ্যে মামলা রুজু করতে হবে।
অত্র অনুচ্ছেদ মোতাবেক বিবাদী যখন একটি সম্পত্তি নিরবচ্ছিন্নভাবে দখলে থাকে, বিবাদীর দখল বাদীর প্রতিকূলে হতে হবে, বাদী ১২ বৎসরের মধ্যে মামলা করবে, মামলা না করলে বিবাদী ঐ সম্পত্তিতে স্বত্বলাভ করবে, বাদী তার স্বত্ব হারাবে, বিবাদীর দখল প্রকাশ্যভাবে হতে হবে ইত্যাদি বিষয়সমূহ বিবেচনা করা হবে।
বেদখলকার অনুমান লাভ বা কোন সুবিধা হতে বঞ্চিত এটি বর্তমানে স্বীকৃত নীতি যে খাজনা দিলে বা কোনরূপ উপস্বত্ব ভোগ না করলে যৌথ সম্পত্তির একজন সহ- শরিক দীর্ঘকাল বিচ্যুত থাকলে এবং আদালতে তা প্রমাণিত হলে বেদখলকার হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে। বৈরী দখল (Adverse possession) প্রকৃত প্রকাশ্য এবং জবর দখল হলেও চলবে। বৈরী দখল সৃষ্টি করতে হলে অন্যের দখল অস্বীকার করে প্রকাশ্য এবং প্রকৃতভাবে জবরদখলে থাকতে হবে। এরূপ জবরদখল অন্যের বিরুদ্ধে ১২ বছরের ঊর্ধ্বকাল কার্যকর করতে হবে [26 CWN 65].

বৈরী দখল দৃশ্যতঃ
বিরূপভাবে জবরদখল, যা অন্যকে বেদখল করে, প্রমাণ করতে হবে- একজন সহ-শরীক যাতে বুঝতে পারে বা জ্ঞাতসারে বেদখল আছে মর্মে বুঝতে পারে, এরূপভাবে হতে হবে [PLD 1962 Kar 209].
একজন শরীকের দখল সকল শরীকের দখল বুঝাবে। এটি বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি। বিশেষ ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম প্রমাণিত হলে বৈরী দখলের সুবিধা আসবে। প্রতিটি কেসই নিজস্ব পারিপার্শ্বিক অবস্থার ও ঘটনার উপর নির্ভর করবে একটি কেসের সঙ্গে অন্যটির তুলনা হবে না।
নিম্নে বৈরী দখল (Adverse possession) এর কিছু উল্লেখযোগ্য নজির প্রদত্তঃ
(১) স্বত্ববিহীন ব্যক্তির দখল অবশ্যই সুনির্দিষ্ট একক এবং প্রকৃত দখল হতে হবে 12 BLD (HC)-43)
(২) বায়নাপত্র মূলে বার বৎসরের ঊর্ধ্বকাল দখল হবে। বাদীর বায়নাপত্র সঠিকভাবে প্রমাণিত না হলেও প্রকৃত মালিকের বিরুদ্ধে দখল প্রমাণিত হলে দখলী স্বত্ত্বের ডিক্রী হওয়ায় কোন বাধা নেই। [ 3 BLD (AD) 315)
(৩) প্রকৃত মালিকের বিরুদ্ধে বৈরী দখল হয় না, এককভাবে দখল করলেই বৈরী দখল হবে না । সনসন খাজনা দেওয়া প্রমাণিত না হলেও মালিক প্রজা সম্পর্ক ক্ষুন্ন হবে 14 BLD (AD). 15).
(৪) তামাদি আইনের ১৪৪ অনুচ্ছেদ মোতাবেক একজনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যভাবে একক দখল করতে হবে (6 BLD (HC)-63)
(৫) ভাড়াটিয়া বৈরী দখল দাবী করতে পারে না [ 6 BLD (AD) 297 38 DLR (AD)-22; 39 CWN-552].
(৬) এমনকি একজন অনুপ্রবেশকারীর দখলও প্রকৃত মালিকের বিরুদ্ধ ছাড়া অন্যের বিরুদ্ধে বৈরী দখল হবে। আইনের মাধ্যম ব্যতিরেকে তাকে উচ্ছেদ করা যায় না। [11 BLD (AD) 144].
(৭) শরীকের নিকট হতে খরিদ করে ১২ বৎসরের ঊর্ধ্বকাল অন্যান্য শরীকগণের জ্ঞাতসারে ভোগদখল করলে বৈরী দখল হবে | 45 DLR (HC)-5411.
(৮) সরকারের বিরুদ্ধে ৬০ বৎসরের ঊর্ধ্বকালের বৈরী দখল প্রমাণ করতে হবে [20 CWN-311].
(৯) প্রকৃত মালিকের বিরুদ্ধে দখল বৈধ ও আইনানুগ | 3 BLD (AD) 315].
(১০) বৈরী দখলের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিরূপ দখল, জবরদখল, বিরতিহীন চলমান দখল এবং প্রকৃত দখল (6 BLT (HC)-311.
(১১) অনুমতি সূত্রে দখল বৈরী দখল হবে না [5 MLR (AD) 72 79].
(১২) প্রকৃত মালিকের দখল যদি আইনানুগ হয় তবে তার বিরুদ্ধে বৈরী দখল হয়
(১৩) মৌখিকভাবে দখল থাকলেও তামাদি আইনের ২৮ ধারা মতে হবে। ঢোল-[20 BLD (HC)-407]. সহরতের প্রয়োজন নেই | 10 BLT (HC)-235 54 DLR (HC) -523].
(১৪) শরীকের নিকট হতে খরিদ করে নাম পত্তনে আলাদাভাবে দখল করলে বৈরী দখল হবে | 10 BLT (HC)-339).
(১৫) পণের টাকার রশিদ যদিও স্বত্বাগম ঘটায় না তবুও ১২ বৎসরের ঊর্ধ্বকালের দখল প্রমাণিত হলে বৈরী দখল হবে | 12 BLT (AD)-27).

(৭) অনুচ্ছেদ ১৮২ঃ
দেওয়ানী মামলার ডিক্রীর পর ডিক্রী বা আদেশের তারিখ হতে তিন বৎসরের মধ্যে অথবা যেকোন ক্ষেত্রে ডিক্রী বা আদেশটির সহিমোহরকৃত নকল রেজিস্টারী করা হয়েছে, সেই তারিখ হতে তিন বৎসরের মধ্যে ডিক্রীজারী দিতে হবে।
এ অনুচ্ছেদ বিবেচনায় নিম্নের বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য
(ক) ডিগ্রী বা আদেশের তারিখ:
(খ) যেখানে আপীল হয়েছে, আপীল আদালতের চূড়ান্ত ডিক্রী বা আদেশের তারিখ বা আপীল খারিজের তারিখ অথবা
(গ) যেখানে রায় পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে সেক্ষেত্রে প্রদত্ত সিদ্ধান্তের তারিখ, অথবা
(ঘ) যেক্ষেত্রে ডিক্রী সংশোধন করা হয়েছে সেই সংশোধনের তারিখ হতে,
(ঙ) যে দরখাস্ত করা হয়েছে, আইন অনুসারে উপযুক্ত আদালত ডিক্রীজারীর সুবিধার্থে যে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য দরখাস্ত করা হয় সেই সম্পর্কে চূড়ান্ত আদেশের তারিখ, অথবা
(চ) টাকার ডিক্রীর বিরুদ্ধে আপীল হইয়া থাকলে ডিক্রীতে টাকা ফেরৎদানের নির্দেশ দেওয়া হলে আপীল আদালতের চূড়ান্ত ডিক্রীর তারিখ বা আপীল প্রত্যাহারের তারিখ, অথবা
(ছ) যেখানে ডিক্রী বা আদেশবলে কোন নির্দিষ্ট তারিখে কোন অর্থ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেই নির্দেশ কার্যকরী করবার জন্য দরখাস্তের ব্যাপারে উক্ত নির্দিষ্ট তারিখ ।
ব্যাখ্যা (১)।
যেক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তির অনুকূলে পৃথক পৃথকভাবে ডিক্রী বা আদেশ প্রদত্ত হয়েছে এবং তাদের প্রত্যেকের ডিক্রীর বিষয়বস্তুর যে অংশ প্রদান বা অর্পণ করতে হবে তা পৃথক করে দেখানো হয়েছে, সেক্ষেত্রে অত্র অনুচ্ছেদের ৫ দফায় যে যে দরখাস্তের বিষয় উল্লেখ আছে তা কেবল অনুরূপ দরখাস্তকারীদের বা তাদের প্রতিনিধিদের অনুকূলে কার্যকরী হবে।
কিন্তু যেক্ষেত্রে ডিক্রী বা আদেশটি একাধিক ব্যক্তির অনুকূলে যৌথভাবে প্রদত্ত হয়েছে সেক্ষেত্রে অনুরূপ দরখাস্ত তাদের একজন বা একাধিক জন অথবা তার বা তাদের প্রতিনিধি কর্তৃক দেওয়া হয়ে থাকলে তাদের সকলের অনুকূলে কার্যকরী হবে।
যেক্ষেত্রে ডিক্রী বা আদেশটি একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পৃথক পৃথকভাবে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের প্রত্যেক ডিক্রী বা আদেশের বিষয়বস্তুর যে অংশ প্রদান বা আপীল করবে তা স্পষ্টরূপে বলা হয়েছে। ডিক্রী সকলের বিরুদ্ধে কার্যকর হবে।
ব্যাখ্যা (২)।
উপযুক্ত আদালত বলতে সে আদালতকে বুঝাবে যার কর্তব্য হচ্ছে ডিক্রীজারী করা বা আদেশ কার্যকরী করা।
বাটোয়ারার প্রাথমিক ডিক্রীর কোন তামাদি শত নেই। তামাদি আইনের ১৮২ অনুচ্ছেদ কার্যকরী হবে।