Category Archives: শিক্ষা

প্রস্তাব বিষয়ক চুক্তি আইন | চুক্তি আইন

প্রস্তাব বিষয়ক চুক্তি আইন আজকের ভিডিও এর আলোচনার বিষয়। “প্রস্তাব বিষয়ক চুক্তি আইন [ Law of Contracts on Proposals ]” ক্লাসটিতে “চুক্তি আইন” সম্পর্কিত সকল তথ্য তুলে ধরা হবে। চুক্তি আইন নিয়ে সকল তথ্য তুলে ধরার জন্য “আইন শিক্ষা গুরুকুল” নিয়ে এসেছে “চুক্তি আইন [ Contract Law ]” সিরিজ। “চুক্তি আইন [ Contract Law ]” সিরিজটির মাধ্যমে আপনারা খুব সহজেই “চুক্তি আইন” সংক্রান্ত সকল বিষয়বস্তু খুব সহজেই বুঝতে পারবেন।

 

প্রস্তাব বিষয়ক চুক্তি আইন

প্রস্তাব উপস্থাপনের বিধানাবলী (Rules regarding offer)

একটি পক্ষ অপর পক্ষের কাছ থেকে সম্মতি/ স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় প্রস্তাব পেশ করা হয়। তাই একটি প্রস্তাব নিয়ম অনুযায়ী পেশ করতে হয়। চুক্তি আইন অনুযায়ী প্রস্তাব পেশ বা উপস্থাপনের বিধান বা নিয়মাবলী নিচে আলোচনা করা হলোঃ

১। ব্যক্ত বা অব্যক্ত উভয় প্রকারের প্রস্তাব হতে পারে ((Proposal can be both expressed or implied)

চুক্তি আইন অনুযায়ী চুক্তি সম্পাদনের জন্য প্রস্তাব ব্যক্ত অব্যক্ত দুই রকম ভাবেই পেশ করা যায়ঃ যেমন-

ক) ব্যক্ত প্রস্তাব (expressed Proposal) যখন কোন প্রস্তাব লিখিত কিংবা মৌখিক কথা/ ভাষা সাহায্যে পেশ করা হয় তখন সেই প্রস্তাব কে ব্যক্ত প্রস্তাব বলা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি সাক্ষাৎকার/ টেলিফোন/ চিঠি/ বিজ্ঞাপন প্রভৃতির মাধ্যমে প্রস্তাব ব্যক্ত করা যেতে পারে।

খ) অব্যক্ত বা ধারণামূলক প্রস্তাব ((implied Proposal) অনেক সময় দেখা যায় যে কোন ব্যক্তি তার আচার-আচরণ কিংবা হাবভাব এর মাধ্যমে প্রস্তাব রেখে থাকেন, এ ধরনের প্রস্তাবকে অব্যক্ত বা ধারণাগত প্রস্তাব বলা হয়।

 

চুক্তি আইন পরিচিতি

 

২. কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি/শ্রেণী/জনসাধারণের উদ্দেশ্যে প্রস্তাব রাখা যায় (Offer can be made for particular person, class or people at large)

চুক্তি আইন অনুযায়ী একটি প্রস্তাব নির্দিষ্ট ব্যক্তি কিংবা নির্দিষ্ট শ্রেণী অথবা জনগণের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা যেতে পারে। যেমন –

ক. নির্দিষ্ট ব্যক্তিঃ ইহান আয়ানকে বললো আমার গাড়িটি তুমি দশ লক্ষ টাকায় কিনবে? তবে এটি হবে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নিকট প্রস্তাব।

খ. নির্দিষ্ট শ্রেণীঃ একটি ক্লাসে বই হারানো গিয়েছে। এ অবস্থায় ক্লাসে সকলের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দেয়া হলো যে বইটি পাওয়া গেলে পুরস্কার প্রদান করা হবে।

গ. সর্বসাধারণঃ জনগণ কে উদ্দেশ্য করে এমন প্রস্তাব করা হলো যে অমুক ব্যক্তি কে ধরিয়ে দিন কিংবা একটি চলচ্চিত্রের জন্য নতুন মুখের সন্ধানে করা হচ্ছে, ইচ্ছুক আগ্রহীগণ অতিসত্বর যোগাযোগ করুন। এরূপ প্রস্তাব হল জনগণ বা সর্বসাধারণের উদ্দেশ্যে পেশকৃত প্রস্তাব।

৩. প্রস্তাব শর্তাধীন হতে পারে(Offer can be conditional)

চুক্তি আইন অনুযায়ী একটি চুক্তির প্রস্তাব শর্তাধীনও হতে পারে। এক বা একাধিক শর্ত জুড়ে দিতে পারে। এক্ষেত্রে জুড়ে দেওয়া শর্ত যুক্তিহীন বা অন্যায় বলে বিবেচিত হবে না।তবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো আমলে নিতে হবে-

ক. চুক্তির প্রস্তাবের শর্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। এমন ক্ষেত্রে অপর পক্ষ দেখে নাই কিংবা বুঝে নাই এরূপ কথা বলে চুক্তি প্রত্যাখ্যান করার কোন সুযোগ নেই।
খ. শর্ত অবশ্যই যুক্তি সঙ্গতভাবে পেশ করা লাগবে। যাতে অন্য পক্ষটি সহজেই সব জানতে ও বুঝতে পারে। অন্যথায় এই ধরনের শর্ত কার্যকর ও প্রযোজ্য হবে না।
গ. চুক্তির প্রস্তাবের ক্ষেত্রে যুক্তিহীন কিংবা অন্যায়মূলক শর্ত কখনোই জুড়ে দেওয়া যাবে না। তাই প্রস্তাবের ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায্য শর্ত বা শর্তসমূহ অবশ্যই থাকতে হবে। অন্যথায় শর্ত বা শর্তসমূহ বলবৎযোগ্য করা যাবে না।

৪. প্রস্তাবের শর্ত সুনির্দিষ্ট রাখা উচিত (Terms of offer must be defined):

প্রস্তাবের শর্ত বা শর্তাবলী সব সময়ই সুনির্দিষ্ট ও সুনিশ্চিত হওয়া উচিত। অনির্দিষ্ট কিংবা অস্পষ্ট প্রস্তাব কখনোই প্রস্তাব বলে গণ্য হয় না। যেমন- কোন চিত্রকরকে বলা হলো যে আমার একটি ছবি এঁকে দিন, আপনাকে কিছু টাকা দেবো। এখানে টাকার পরিমাণ অস্পষ্ট, তাই এটি প্রস্তাব নয়।

৫. শুধুমাত্র ইচ্ছা প্রকাশ বা বিবৃতি দিলেই প্রস্তাব হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না (An intention or statement alone cannot be accepted as offer)

সম্মতি লাভের উদ্দেশ্য ব্যতিত কোন ইচ্ছা, বক্তব্য বা বিবৃতি আইনত প্রস্তাব বলে গণ্য হয় না। যেমন – বাবা তার মেয়ের হবু জামাইকে বললো, আমার মৃত্যুর পর সকল সম্পত্তিই মেয়ে পাবে। এটা তার শুধুই ইচ্ছে প্রকাশ। এটিকে প্রস্তাব হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

 

 

৬. প্রস্তাব ও প্রস্তাবের আমন্ত্রণ পাওয়া এক বিষয় নয় (Offer & invitation to an offer isn’t be same thing)

একটি প্রস্তাব ও কোন প্রস্তাবের আমন্ত্রণ এক বিষয় নয়। যদি দোকানি কোন মূল্য তালিকা বিলি করে থাকে তবে এটি এক্ষেত্রে প্রস্তাবের আমন্ত্রণ হিসেবে গন্য হবে, প্রস্তাব হিসেবে নয়। যেমন- ঘোষণা করা হলো একটি কুকুর হারিয়ে গিয়েছে, কেউ পেলে তাকে ৫০০০ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে, এমন হলে এটা একটা প্রস্তাব।

৭. প্রস্তাবগ্রহীতাকে অবশ্য প্রস্তাব সম্পর্কে জানাতে হবে (Offer must be communicated to be offeree):

যার উদ্দেশ্যে প্রস্তাব করা হয়েছে তাকে অবশ্যই তা জানাতে হবে অন্যথায় তিনি তাতে স্বীকৃতি দিতে পারবেন না। কেউ যদি প্রস্তাব না জেনে প্রস্তাবিত কাজ করে দিলেও চুক্তি হিসেবে গণ্য হবে না এবং পারিশ্রামিকও পাবেন না। এক্ষেত্রে Lalmon Vs Gouri Dutt 11 A.L.J. 489 মামলার বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে। গৌরী দত্তের ভ্রাতুস্পুত্র হারিয়ে গেলে ৫০১ টাকা পুরস্কার হিসেবে ঘোষণা করা হলো।

এদিকে বাচ্চা হারিয়ে গেছে বলে কাজের ছেলে-লালমনের খারাপ লাগলো। তাই সে খুঁজতে বের হলো। কিন্তু সে এই পুরস্কারের ঘোষণা জানতো না। তাই যখন বাচ্চাটি খুঁজে নিয়ে এসে লালমন টাকা দাবি করলেও আদালত বললো- যেহেতু পুরস্কারের ঘোষণা সম্পর্কে লালমন কিছুই জানেন না; তাই লালমন পুরস্কারও পাবেন না।

৮. প্রস্তাবে আইনগত সম্পর্ক স্থাপনের অভিপ্রায় থাকা উচিত (Proposal should have the intention of establishing a legal relationship)

একটি প্রস্তাবকে আইনগত ভিত্তির উপর ধার করাতে হলে প্রস্তাবের দ্বারা আইনগত সম্পর্ক স্থাপনের অভিপ্রায় বা ইচ্ছা অবশ্যই থাকতে হবে। উদাহারন হিসেবে বলা যায়, কোন বাসায় খাবার নিমন্ত্রণ করা হলো। এখানে একে অপর পক্ষ রাজী হয়ে নিমন্ত্রণে এসেছে তার পরও এটি চুক্তি হিসেবে গণ্য করা যাবে না। কারণ এরূপ নিমন্ত্রণে চুক্তির ইচ্ছা থাকে না।

৯. গৃহীত হওয়ার পূর্বে প্রস্তাব প্রত্যাহার করা যায় (The proposal can be revoked before it is accepted)

চুক্তি আইন-১৮৭২ এর ৫ ধারার বিধানানুসারে প্রস্তাব স্বীকৃত হওয়ার এবং প্রস্তাবকের বিপক্ষে স্বীকৃতির স্থাপন কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বে প্রস্তাব প্রত্যাহার করন্দ্র সুযোগ থাকে, কিন্তু এর পরে আর সে সুযুগ থাকে না। প্রস্তাব প্রত্যাহার ব্যতিত বিশেষ ক্ষেত্রে তামাদি কিংবা বাতিলের মাধ্যমে প্রস্তাব প্রত্যাহার করা যেতে পারে।

১০. কোন প্রস্তাব চিরদিন বজায় থাকে না (Any offer isn’t stand for ever)

প্রস্তাবে স্বীকৃতির একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে, সময়সীমা না থাকলে যুক্তিসঙ্গত সময়ের পর এমনিতেই প্রস্তাবের বিলুপ্ত ঘটে যেতে পারে। তাই যুক্তিসঙ্গত সময়, পরিবেশ- পরিস্থিতির অবস্থা বিবেচনা এনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তাব রাখা উচিত।

উপরের আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার যে, কিছু নিয়মের মধ্য দিয়েই প্রস্তাব উপস্থাপন করতে হয়। তা না হলে চুক্তি আইন-১৮৭২ অনুযায়ী প্রস্তাব আলোর মুখ দেখে না, আইনগত চুক্তি হিসেবেও পরিগণিত হয় না।

 

প্রস্তাব বিষয়ক চুক্তি

 

প্রস্তাব বিষয়ক চুক্তি আইন নিয়ে বিস্তারিত ঃ

বাংলাদেশের চুক্তি আইনের পরিচিতি

চুক্তি আইন আধুনিক দেওয়ানী আইনের ভিত্তি। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্র—সকল আর্থিক ও সামাজিক লেনদেনের মূলভিত্তি হলো চুক্তি। বাংলাদেশে চুক্তিসংক্রান্ত সকল আইনি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে চুক্তি আইন, ১৮৭২

এই আইনের মৌলিক ধারণা সহজভাবে তুলে ধরার লক্ষ্যে “আইন শিক্ষা গুরুকুল” প্রণয়ন করেছে “চুক্তি আইন (Contract Law)” সিরিজ, যেখানে ধাপে ধাপে চুক্তি আইনের প্রতিটি অধ্যায় আলোচনা করা হয়।

 

চুক্তি আইন পরিচিতি

 

১. চুক্তি আইন, ১৮৭২ : ঐতিহাসিক পটভূমি

চুক্তি আইন, ১৮৭২ মূলত ইংরেজি কমন লব্রিটিশ ভারতীয় চুক্তি আইনের ভিত্তিতে প্রণীত।
উনিশ শতকে ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষে এটি প্রবর্তিত হয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পুনরায় জাতীয় সংসদের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়।

বর্তমানে এটি বাংলাদেশের প্রধান চুক্তি আইন হিসেবে বলবৎ রয়েছে।

 

চুক্তি আইন পরিচিতি

 

২. চুক্তি আইনের পরিসর

চুক্তি আইন, ১৮৭২–এ নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—

  • প্রস্তাব ও গ্রহণযোগ্যতা
  • বৈধ ও অবৈধ চুক্তি
  • বাতিলযোগ্য ও বাতিল চুক্তি
  • কন্টিনজেন্ট চুক্তি
  • চুক্তির বাস্তবায়ন
  • চুক্তি ভঙ্গ ও ক্ষতিপূরণ
  • জামিন (Guarantee)
  • সংস্থা (Agency)
  • অংশীদারিত্ব (Partnership)
  • বিবেচনা (Consideration)
  • ভুল উপস্থাপনা ও প্রতারণা

 

৩. চুক্তি আইনের প্রয়োজনীয়তা

চুক্তি আইন একটি মৌলিক দেওয়ানী আইন। অন্যান্য দেওয়ানী আইন যেমন—পণ্য বিক্রয় আইন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন—সবগুলোর ভিত্তি হিসেবে চুক্তি আইন কাজ করে।

চুক্তি আইনের প্রয়োজনীয়তা নিম্নরূপ—

  • অধিকার ও দায় নিশ্চিতকরণ
    চুক্তির মাধ্যমে পক্ষগণের অধিকার ও কর্তব্য নির্ধারিত হয়।
  • লেনদেনের নিরাপত্তা
    পণ্য, সেবা, সম্পত্তি ও অর্থ লেনদেনে আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
  • বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সহায়তা
    ব্যবসা পরিচালনা, অফিস ভাড়া, মাল ক্রয়, পরিবহন, ব্যাংক লেনদেন—সব ক্ষেত্রেই চুক্তির প্রয়োগ রয়েছে।
  • বিবাদ নিষ্পত্তির পথ
    চুক্তি ভঙ্গ হলে আইনগত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

 

৪. চুক্তি আইনের উদ্দেশ্য

চুক্তি আইনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো—

  • পক্ষগণ যেন তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে
  • অপর পক্ষের অধিকার সংরক্ষণ করা
  • চুক্তি ভঙ্গ হলে ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকার নিশ্চিত করা

চুক্তি আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে চুক্তিসংক্রান্ত মৌলিক বিষয়ের সংজ্ঞা, নীতিমালা ও আইনি কাঠামো নির্ধারণের জন্য। যেমন—
প্রস্তাব, প্রতিদান, অঙ্গীকার, বাতিল চুক্তি, কন্টিনজেন্ট চুক্তি ইত্যাদি।

৫. চুক্তি আইনের সীমাবদ্ধতা

চুক্তি আইন, ১৮৭২ একটি মৌলিক আইন হলেও এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্যান্য আইনে নিয়ন্ত্রিত হয়—

বিষয় প্রযোজ্য আইন
সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদন, চুক্তি বাতিল সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭
পণ্য ক্রয়-বিক্রয় পণ্য বিক্রয় আইন, ১৯৩০
স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২

অতএব, চুক্তি আইন একা সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে না; বরং এটি অন্যান্য দেওয়ানী আইনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

 

 

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে চুক্তি আইন একটি অপরিহার্য ভিত্তি। এটি পক্ষগণের স্বাধীনতাকে সীমার মধ্যে এনে আইনি সুরক্ষা প্রদান করে। চুক্তির মাধ্যমে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সম্পর্ক আইনসম্মত ও সুসংহত হয়।

চুক্তি আইন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা একজন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও আইনজীবীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আপনি চাইলে আমি এই লেখাটি নোট, লেকচার স্ক্রিপ্ট বা প্রশ্নোত্তর আকারেও সাজিয়ে দিতে পারি।

চুক্তি আইন পরিচিতি নিয়ে বিস্তারিত ঃ

চুক্তি আইন অনুযায়ী চুক্তির বাস্তবায়ন

চুক্তি আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো চুক্তির বাস্তবায়ন। একটি চুক্তি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার প্রতিশ্রুতিসমূহ বাস্তবে পালন করা হয়। শুধুমাত্র চুক্তি সম্পাদনই যথেষ্ট নয়; বরং চুক্তির মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয় তখনই, যখন উভয় পক্ষ তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে।

চুক্তি আইন সম্পর্কিত জ্ঞান সহজভাবে উপস্থাপনের লক্ষ্যে “আইন শিক্ষা গুরুকুল” নিয়ে এসেছে চুক্তি আইন (Contract Law) সিরিজ। এই সিরিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো— চুক্তির বাস্তবায়ন

 

চুক্তির বাস্তবায়ন

 

১. চুক্তির বাস্তবায়ন কী?

চুক্তি পালনের অর্থ হলো, চুক্তির পক্ষসমূহের উপর আরোপিত দায় ও প্রতিশ্রুতিসমূহ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা।

চুক্তি আইনের ধারা ৩৭ অনুসারে:

“The parties to a contract must either perform or offer to perform their respective promises, unless such performance is dispensed with or excused under the provisions of this Act or of any other law.”

অর্থাৎ—
চুক্তির প্রত্যেক পক্ষকে অবশ্যই তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করতে হবে অথবা পালনের প্রস্তাব দিতে হবে, যদি না কোনো আইনগত বিধান তাদেরকে সেই দায় থেকে অব্যাহতি দেয়।

এই সংজ্ঞা থেকে চুক্তি বাস্তবায়নের দুটি মৌলিক উপাদান পাওয়া যায়—

  1. প্রতিশ্রুতি পালন

  2. প্রতিশ্রুতি পালনের প্রস্তাব

২. চুক্তি পালনের প্রস্তাব (Tender)

চুক্তি পালনের প্রস্তাবকে দাখিল (Tender) বলা হয়।
দাখিল মানে চুক্তি বাস্তবে পালন নয়; বরং চুক্তি পালনের জন্য আন্তরিক ও বৈধ প্রয়াস।

চুক্তি আইনের ধারা ৩৮ অনুসারে, নিম্নোক্ত শর্তসমূহ পূরণ হলে একটি দাখিল আইনসম্মত বলে গণ্য হবে—

(ক) প্রস্তাব অবশ্যই শর্তহীন হতে হবে

যদি প্রস্তাবের সঙ্গে কোনো অতিরিক্ত শর্ত যুক্ত থাকে, তবে তা চুক্তি পালনের বৈধ প্রস্তাব হিসেবে গণ্য হবে না।

(খ) সঠিক সময় ও সঠিক স্থানে প্রস্তাব

চুক্তিতে নির্ধারিত সময় ও স্থানে দাখিল করতে হবে।
এই বিষয় নির্ধারণে ধারা ৪৬–৫০ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

(গ) যুক্তিসংগত সুযোগ প্রদান

প্রতিশ্রুতি গ্রহীতাকে অবশ্যই যুক্তিসংগত সময় ও সুযোগ দিতে হবে, যেন তিনি প্রস্তাব গ্রহণ বা যাচাই করতে পারেন।

(ঘ) পরীক্ষার সুযোগ

যদি দ্রব্য সরবরাহের বিষয় থাকে, তবে প্রতিশ্রুতি গ্রহীতাকে তা পরীক্ষা করার সুযোগ দিতে হবে।

৩. কে চুক্তি পালন করবে?

চুক্তি কে পালন করবে—এ বিষয়ে চুক্তি আইনে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।

১. ব্যক্তিগতভাবে পালন (ধারা ৪০)

যদি চুক্তি প্রতিশ্রুতিদাতার দক্ষতা, সুনাম, নৈপূণ্য বা রুচি–র সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়, তবে সেই ব্যক্তি নিজেই চুক্তি পালন করতে বাধ্য।

২. প্রতিনিধি দ্বারা পালন

যেসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দক্ষতা আবশ্যক নয়, সেসব ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিদাতা তার প্রতিনিধি দ্বারা চুক্তি পালন করাতে পারেন।

৩. তৃতীয় পক্ষ দ্বারা পালন

প্রতিশ্রুতি গ্রহীতা যদি তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছ থেকে চুক্তি পালনের বিষয় গ্রহণ করেন, তবে তিনি মূল প্রতিশ্রুতিদাতার বিরুদ্ধে আর দাবি তুলতে পারবেন না।

৪. প্রতিশ্রুতিদাতার মৃত্যু

  • যদি চুক্তি ব্যক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই চুক্তির দায় শেষ হয়।
  • অন্য ক্ষেত্রে, প্রতিশ্রুতিদাতার আইনগত প্রতিনিধি বা উত্তরাধিকারী তার সম্পত্তির সীমার মধ্যে চুক্তি পালনে বাধ্য থাকবেন।

 

৫. যৌথ প্রতিশ্রুতি

যদি দুই বা ততোধিক ব্যক্তি যৌথভাবে প্রতিশ্রুতি দেন, তবে তারা যৌথভাবে বা পৃথকভাবে চুক্তি পালনে দায়বদ্ধ থাকবেন।

 

চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে বিস্তারিত ঃ

 

চুক্তির বাস্তবায়ন চুক্তি আইনের প্রাণভিত্তি। প্রতিশ্রুতি পালনের মাধ্যমেই চুক্তির উদ্দেশ্য পূরণ হয় এবং আইনগত সম্পর্ক কার্যকর রূপ পায়। ধারা ৩৭ থেকে ৪৫ পর্যন্ত বিধানসমূহ চুক্তির বাস্তবায়নের কাঠামো নির্ধারণ করে এবং পক্ষসমূহকে আইনের আলোকে তাদের দায় পালনে পথনির্দেশ দেয়।

আপনি চাইলে আমি পরবর্তী অংশে চুক্তি বাস্তবায়নের অব্যাহতি, অসম্ভবতা, ভঙ্গ ও ক্ষতিপূরণ বিষয়গুলোও সংযোজন করে সম্পূর্ণ অধ্যায় তৈরি করে দিতে পারি।