ভূমি জরিপ হলো জমির সীমানা নির্ধারণ, পরিমাণ নির্ণয় এবং নকশা তৈরির একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। জমি ক্রয়-বিক্রয়, উত্তরাধিকার বণ্টন, খতিয়ান সংশোধন, নামজারি, দখল সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি—সবক্ষেত্রেই সঠিক জরিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভুল জরিপের কারণে জমি নিয়ে বিবাদ, মামলা ও আর্থিক ক্ষতি হয়। তাই মাঠে কাজ করার আগে কী কী প্রস্তুতি নিতে হবে, কীভাবে পরিমাপ করতে হবে এবং কীভাবে নকশা তৈরি করতে হবে—তা জানা অত্যাবশ্যক।
এই লেখায় ভূমি জরিপের ধাপে ধাপে করণীয়, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং খতিয়ান পাঠের কৌশল সহজভাবে আলোচনা করা হলো।

Table of Contents
ভূমি জরিপে অত্যাবশ্যকীয় করণীয়
ধাপ–১ : প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ (Reconnaissance)
জরিপ শুরুর আগে প্রথম কাজ হলো পুরো জমিটি ঘুরে দেখা। একে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ বলা হয়।
কেন এটি জরুরি?
কারণ মাঠে কী কী বাধা আছে, কোথা দিয়ে চেইন বা ফিতা টানা সহজ হবে, কোথায় গাছ, পুকুর, ঘর, নালা, খাল বা রাস্তা রয়েছে—এসব না জানলে পরিমাপে ভুল হবে।
কী কী দেখবেন?
- জমির চারপাশে কোন প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট বাধা আছে কি না
- জমির আকৃতি (আয়তাকার, ত্রিভুজ, অনিয়মিত)
- কোথায় ভাঙা বা বাঁকা সীমানা
- কীভাবে জমিটিকে ২, ৩ বা ৪ ভাগে ভাগ করলে সহজে পরিমাপ করা যাবে
এই ধাপে আপনি ঠিক করবেন—জমিটিকে কতগুলো ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজে ভাগ করবেন।

ধাপ–২ : স্টেশন ও স্টেশন লাইন নির্বাচন
জরিপে স্টেশন মানে হলো এমন একটি নির্দিষ্ট বিন্দু, যেখান থেকে মাপ নেওয়া শুরু হবে।
কীভাবে করবেন?
- সুবিধাজনক ও খোলা জায়গা নির্বাচন করুন
- সেখানে একটি খুঁটি পুঁতে দিন
- এটিই হবে আপনার প্রথম স্টেশন
- এরপর অপর একটি পয়েন্ট বেছে নিয়ে তার সঙ্গে একটি স্টেশন লাইন তৈরি করুন
এইভাবে পুরো জমিটিকে কয়েকটি ছোট প্লটে ভাগ করুন, যেন প্রতিটি অংশ সহজে মাপা যায়।
ধাপ–৩ : কাগজে নকশা (Field Sketch)
মাঠে মাপ নেওয়ার আগে কাগজে একটি খসড়া নকশা আঁকুন।
কী করবেন?
- প্রতিটি স্টেশন চিহ্নিত করুন
- প্রতিটি অংশকে A, B, C, D নামে চিহ্ন দিন
- ফিতা বা চেইন দিয়ে মাপ নিয়ে কাগজে লিখুন
- সব অংশের ক্ষেত্রফল বের করে যোগ করুন
- এভাবেই পুরো জমির মোট ক্ষেত্রফল পাবেন
জরিপ কাজে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি
| যন্ত্র | ব্যবহার |
|---|---|
| গান্টার চেইন / ফিতা | দৈর্ঘ্য মাপার জন্য |
| তিন পায়া টেবিল | নকশা রাখার জন্য |
| লগি | দূরত্ব মাপতে |
| থ্রি-থার্টি স্কেল | স্কেল তৈরিতে |
| খুঁটি | স্টেশন চিহ্নিত করতে |
| রুলার | দাগ টানতে |
| চাঁদা | চিহ্ন দিতে |
| ওলন | দিক নির্ণয়ে |
| পেন্সিল | লিখতে |
| আলামত তালিকা | সীমানা চিহ্নের বিবরণ |
| শিট ও কাগজ | নকশা আঁকতে |
খতিয়ানে কড়া–ক্রান্তি হিসাব বোঝা
বাংলাদেশে খতিয়ান সাধারণত দুইভাবে লেখা হয়:
- দশমিক পদ্ধতি
- কড়া–ক্রান্তি পদ্ধতি
অনেকে দশমিক বোঝেন, কিন্তু কড়া–ক্রান্তি বুঝতে পারেন না।
কড়া–ক্রান্তির সম্পর্ক:
- ১ কানি = ২০ গণ্ডা
- ১ গণ্ডা = ৪ কড়া
- ১ কড়া = ৩ ক্রান্তি
খতিয়ানের মালিকানা যোগ করার সময় প্রথমে যোগ করে দেখবেন — বিন্দু সূত্রে মিলছে, না যব সূত্রে মিলছে। যে কোনো একটি সূত্রে মিললেই হিসাব সঠিক ধরা হবে।
ভূমি জরিপ একটি দায়িত্বপূর্ণ কাজ। সামান্য ভুল বড় আইনি জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। তাই পর্যবেক্ষণ, পরিকল্পনা, সঠিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও হিসাব যাচাই—এই চারটি ধাপ মেনে চললেই একটি নির্ভুল জরিপ সম্ভব।