চুক্তির জামিন | চুক্তি আইন

চুক্তির জামিন আজকের ভিডিও এর আলোচনার বিষয়। “চুক্তি আইন – চুক্তির জামিন [ Law of Contracts on Bailment of Contracts ]” ক্লাসটিতে “চুক্তি আইন” সম্পর্কিত সকল তথ্য তুলে ধরা হবে। চুক্তি আইন নিয়ে সকল তথ্য তুলে ধরার জন্য “আইন শিক্ষা গুরুকুল” নিয়ে এসেছে “চুক্তি আইন [ Contract Law ]” সিরিজ। “চুক্তি আইন [ Contract Law ]” সিরিজটির মাধ্যমে আপনারা খুব সহজেই “চুক্তি আইন” সংক্রান্ত সকল বিষয়বস্তু খুব সহজেই বুঝতে পারবেন।

 

চুক্তির জামিন

চুক্তি পরিসমাপ্তির পদ্ধতিসমূহ

Methods of Termination

চুক্তি দ্বারা পক্ষগনের মধ্যে দায় বা বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয় যখন এ দায় বা বাধ্যবাধকতা সমাপ্ত হয় তখন চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘটে। বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে চুক্তি পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। এ পদ্ধতিসমূহ হলো:

১। চুক্তি পালনের মাধ্যমে চুক্তির পরিসমাপ্তি
২। সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তির পরিসমাপ্তি
৩। পরবর্তী অসম্ভবতার জন্য চুক্তির পরিসমাপ্তি
৪। আইনের প্রয়োগ দ্বারা চুক্তির পরিসমাপ্তি
৫। সময় অতিবাহিত হওয়ার ফলে চুক্তির পরিসমাপ্তি
৬। অনুমতি ব্যতীত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ফলে চুক্তির পরিসমাপ্তি
৭। চুক্তি ভংগ করায় চুক্তির পরিসমাপ্তি

নিম্নে উপরোক্ত পদ্ধতিসমূহ আলোচনা করা হলো।

 

চুক্তিতে প্রতারণা

 

১। পালনের দ্বারা পরিসমাপ্তি (Termination by Performance)

চুক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট পক্ষগন যখন তারা তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করে তখন তাদের দায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে। যখন চুক্তির সকল পক্ষ তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন তখন চুক্তিটির সম্পূর্ণ পরিসমাপ্তি হয়। আবার যদি চুক্তির এক পক্ষ তার প্রতিশ্রুতি পালনের প্রস্তাব করেন অন্য পক্ষ তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জনান তখন প্রথম পক্ষের দায় পরিসমাপ্ত হবে।

 

২। সমঝোতার ভিত্তিতে চুক্তির পরিসমাপ্তি (Termination by Mutual Agreement)

সকল পক্ষের সম্মতিতে চুক্তি বাতিল বা বাদ দেওয়া অথবা শর্তসমূহ পরিবর্তন করা অথবা বিকল্প চুক্তি প্রতিস্থাপন করা যায়। এ কার্যগুলির যে কোনো একটির মাধ্যমে পুরাতন চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘটানো যায়। সমঝোতার ভিত্তিতে নিম্নলিখিত যে কোনো একটি উপায়ে চুক্তির পরিসমাপ্তি হতে পারে।
ক) বিকল্প চুক্তি: এ প্রকার চুক্তির ফলে পুরাতন চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘটে নতুন চুক্তি সৃষ্টি হয় এবং চুক্তির পক্ষসমূহ একই থাকতে পারে বা পরিবর্তন হতে পারে। যেমন-

খ) চুক্তিরশর্ত পরিবর্তন: চুক্তির শর্ত পরিবর্তন বলতে বুঝায় চুক্তির এক বা একাধিক শর্তসমূহের পরিবর্তন। এ ধরনের পরিবর্তন যদি চুক্তির সকল পক্ষের সম্মতিতে করা হয় তবে তা বৈধ হবে। এ পরিবর্তনে শুধুমাত্র শর্তের পরিবর্তন হয় পক্ষসমূহের পবির্তন হয় না। চুক্তির শর্ত পরিবর্তনের ফলে পুরাতন চুক্তির আর অস্তিত্ব থাকে না তার পরিসমাপ্তি হয়।

গ) অব্যাহতি প্রদান অব্যাহতি বলতে বোঝায় চুক্তিতে যা বলা হয়েছে তার চেয়ে কম গ্রহণ করা। বাংলাদেশের আইনে প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ন বা আংশিক অব্যাহিত দেওয়া যায় এবং এর জন্য কোনো প্রতিদান প্রয়োজন হয় না। যেমন, ‘ক’ ৫০০০/ টাকা ‘খ’ এর নিকট থেকে ধার নিয়েছে। ‘ক’ ৫০০০/ টাকার পরির্বতে ৪০০০/ টাকা প্রদান করলো এবং ‘খ’ খুশি মনে তা গ্রহণ করলো। এর ফলে পুরাতন ঋণের সমাপ্তি হলো। চুক্তির যে পক্ষকে অধিকার দেওয়া থাকে সে পক্ষ যদি তা ত্যাগ করে তবে অপর পক্ষ দায় মুক্ত হন, তার আর কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না।

ঙ) অংগীভূতকরণ: যখন একই ব্যক্তির বড় অধিকার এবং ক্ষুদ্র অধিকার এক সাথে মিলিত হয় তখন ক্ষুদ্র অধিকার বড় অধিকারে নিকট বিলীন হয়ে যায় যেমন-

এক ব্যক্তি কিছু জমি লিজ নিয়ে ছিল, পরবর্তীতে সে জমিটি ক্রয় করে নেয়। এর ফলে তার লিজ চুক্তি সমাপ্ত হয়ে যায় এবং তা মালিকানায় রুপান্তর হয়।

 

৩। পরবর্তী অসম্ভবতার ফলে চুক্তির পরিসমাপ্তি (By subsequent supervening impossibility)

চুক্তি করার সময় যে কাজ সম্পাদন করা সম্ভব ছিল তা পরবর্তী কালে অসম্ভব বা অবৈধ হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে। এ পরিস্থিতিকে উত্তরকালীন অসম্ভাব্যতা (supervening impossibility) বলে। একে আবার নৈরাশ্য মতবাদ (doctrine of frustration) বলা হয়। উত্তরকালীন অসম্ভাব্যতা অনেক কারনে হতে পারে, তাদের মধ্যে অন্যতম:

ক) চুক্তির বিষয়বস্তুর ধ্বংস চুক্তির কার্যকারিতা যদি কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর উপর নির্ভর করে এবং পরবর্তীতে তা বিনষ্ট হয়ে যায় তবে চুক্তি বাতিল হবে। যেমন-একটি কমিউনিটি সেন্টার বিয়ের জন্য ভাড়া নেওয়া হলো। কিন্তু নির্ধারিত দিনের পূর্বে কমিউনিটি সেন্টারটি আগুনে পুড়ে যায়, ফলে বিবাহ অনুষ্ঠান পরিচালনা করা সম্ভব না। এক্ষেত্রে সেন্টারের মালিককে দায়ী করা যাবে না এবং চুক্তিটি বাতিল বলে গন্য হবে।

খ) আইনের পরিবর্তন: আইনের পরবর্তী পরিবর্তনের ফলে চুক্তি বৈধতা হারাতে পারে। এ ক্ষেত্রে মূল চুক্তিটি বাতিল বলে গণ্য হবে। যেমন ভারতের পেঁয়াজ ক্রয়ের জন্য ‘খ’ ভারতের সরবরাহকারীর সাথে চুক্তি করে। পরবর্তীতে ভারত সরকার পেঁয়াজ রপ্তানী বন্ধ করে দেয় ফলে ‘খ’ কে সরবরাহকারী পেঁয়াজ সরবরাহ করতে পারেনি। চুক্তিটি বাতিল বলে
গন্য হবে।

গ) পূর্ব শর্তের বিফলতা: যখন কোনো চুক্তি করা হয় তখন ধরে নেওয়া হয় বর্তমানে যে অবস্থা বিদ্যমান আছে তার ধারাবাহিকতা থাকবে। যদি সে অবস্থার পরিবর্তন হয় তবে চুক্তি পরিসমাপ্তি ঘটবে। যেমন- ‘ক’ এবং ‘খ’ একে- অপরকে বিয়ের চুক্তি করলো। বিয়ের কয়েকদিন পূর্বে ‘ক’ পাগল হয়ে গেল। চুক্তিটি বাতিল বলে গন্য হবে।

ঘ) মৃত্যু বা ব্যক্তিগত অক্ষমতা যে সকল ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগ্যতার ভিত্তিতে চুক্তি সম্পাদিত হয় সে সকল ক্ষেত্রে মৃত্যু অথবা ব্যক্তিগত অক্ষমতার কারনে চুক্তির পরিসমাপ্তি হয়। যেমন-ক একটি গান গাওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হলো এবং প্রতিদান হিসেবে কিছু অর্থ দেওয়া হলো। কিন্তু চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর ক এমন অসুস্থ হলো যে তার পক্ষে গান গাওয়া সম্ভব ছিল না। এক্ষেত্রে চুক্তিটি বাতিল হবে।

ঙ) যুদ্ধের প্রাদুর্ভাব: যুদ্ধ কালীন সময় শত্রু দেশের সাথে চুক্তি বাতিল বলে ধরা হয়। যুদ্ধের পূর্বে যদি দুই দেশের নাগরিকের মধ্যে চুক্তি হয় এবং পরবর্তীতে যুদ্ধ শুরু হয় তবে চুক্তি স্থগিত হয়ে যাবে। যুদ্ধের পরে চুক্তি পুন:বহাল বা বলবৎ করা যেতে পারে।

 

 

৪। আইন দ্বারা চুক্তির পরিসমাপ্তি (By operation of Law):

আইন দ্বারা যে সকল ক্ষেত্রে চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘটে সেগুলি হলো মৃত্যু, দেওলিয়া এবং একত্রীকরণ।

মৃত্যু: যে সকল চুক্তি ব্যক্তির নৈপূণ্য অথবা সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল সে ক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তির মৃত্যু হলে চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘটবে। যেমন, কোনো নাট্যকারের সাথে নাটকে অভিনয় করার চুক্তি হলো, কিন্তু কিছু দিনের মধ্যে তার মৃত্যু হওয়ায় তার পক্ষে নাটক করা সম্ভব হলো না। অবশ্য অন্যান্য ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির অধিকার এবং দায় তার আইনগত প্রতিনিধির উপর পড়বে।

দেওলিয়া: দেওলিয়ার অধিকার এবং দায় কিছু ব্যতিক্রম ব্যতিত আদালতে অর্পিত হয়। দেওলিয়ার সাধারনত কোনো অধিকার এবং দায় থাকে না।

একত্রীকরণ: বড় অধিকারের নিকট ক্ষুদ্র অধিকার বিলীন হয়ে যায়। যেমন, ‘ক’ তার গাড়ী ‘খ’ কে ভাড়া দেয়, পরবর্তীতে ‘খ’ গাড়ীটি ক্রয় করে নেয়। গাড়ী ক্রয়ের ফলে ‘ক’ ও ‘খ’এর ভাড়ার চুক্তিটির পরিসমাপ্তি হবে।

 

৫। সময় অতিবাহিত হওয়ার ফলে চুক্তির পরিসমাপ্তি (By lapse of time)

চুক্তিতে কার্য সম্পাদনের সময় নির্দিষ্ট থাকলে এবং সে সময়ে কার্য সম্পাদন না করলে চুক্তির পরিসমাপ্তি হতে পারে। বিশেষ করে যেখানে সময় একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়।

 

৬। অনুমিত ব্যতিত গুরুত্বপূর্ন পরিবর্তন করা হলে (By material alteration)

পক্ষগনের অনুমিত ব্যতিত যদি চুক্তির গুরুত্বপূর্ন পরিবর্তন করা হয় তবে চুক্তির পরিসমাপ্তি হবে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বলতে সে ধরনের পরিবর্তন বোঝানো হয়েছে যা পক্ষগণের অধিকার এবং দায়কে যথেষ্ট প্রভাবিত করবে। যেমন অর্থের পরিমানের পরিবর্তন, অর্থ পরিশোধের সময়ের পরিবর্তন, পরিশোধের স্থানের পরিবর্তন, পক্ষগনের নামের পরিবর্তন ইত্যাদি। অবশ্য যে সকল পরিবর্তন পক্ষগনের অধিকার এবং দায় প্রভাবিত করে না অথবা চুক্তি কার্যকারিতার উপর প্রভাব বিস্তার করে না সে পরিবর্তন চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘটায় না, যেমন মুদ্রন ত্রুটি, নামের ভুল বানান ইত্যাদি।

 

৭। চুক্তি ভংগ করার চুক্তির পরিসমাপ্তি (By breach of contract)

একটি পক্ষ চুক্তি ভংগ করলে তখন অপর পক্ষ বা পক্ষসমূহ চুক্তি সম্পাদনের বধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পায়। চুক্তি ভংগ বলতে বোঝায় এক পক্ষের চুক্তি পালনে ব্যর্থতা অথবা চুক্তি পালনে অস্বীকৃতি, অথবা চুক্তি পালনে অক্ষমতা। চুক্তি ভংগ করলে অপরপক্ষ ক্ষতিপূরণ পেতে পারে বা সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদনের দাবী করতে পারে। আবার এই দুইটি প্রতিকার এক সংগে পাওয়া যেতে পারে।

আদালত যদি সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদনের নির্দেশ দেয় তবে চুক্তির পরিসমাপ্তি হবে না। অপরপক্ষ যদি চুক্তির জন্য ক্ষতিপূরন দাবী করে বা নিজে চুক্তি বাতিল করে তাহলে চুক্তির পরিসমাপ্তি হবে। চুক্তি ভংগের শ্রেনীকরন বিভিন্ন ভাবে করা যেতে পারে। যেমন সমগ্র না আংশিক চুক্তি ভংগ, বা মূখ্য শর্ত না গৌণ শর্ত ভংগ। তবে ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষের দৃষ্টিকোন থেকে চুক্তি ভংগের শ্রেনিকরন নিম্নলিখিতভাবে করা যায়:

১। অনুমানমূলক বা গঠনমূলক চুক্তি ভংগ
২। প্রকৃত বা বর্তমান চুক্তি ভংগ

অনুমানমূলক বা গঠনমূলক চুক্তি ভংগ (Anticipatory or constructive breach of contract): যখন এক পক্ষ চুক্তি পালনের নির্ধারিত সময়ের পূর্বে তার দায় পালনে অস্বীকৃতি জানায় অথবা যখন এক পক্ষ তার আচরন বা কার্য দ্বারা বুঝিয়ে দেয় তার পক্ষে চুক্তি পালন সম্ভব না তখন তাকে গঠনমূলক বা অনুমানমূলক চুক্তি ভংগ বলে। এধরনের চুক্তি ভঙ্গ নিম্নলিখিতভাবে হতে পারে:

ক) অস্বীকৃতির মাধ্যমে
খ) কার্য পালনে অসম্ভবতার ফলে

 

চুক্তির জামিন

 

চুক্তির জামিন নিয়ে বিস্তারিত ঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *