বাংলাদেশে জমির হিসাব ও পরিমাপের ইতিহাস বহু প্রাচীন। আজ আমরা একর–শতক, হেক্টর ইত্যাদি আন্তর্জাতিক এককে জমির মাপ করি। কিন্তু এই আধুনিক ব্যবস্থার আগে গ্রামবাংলা ও উপমহাদেশে ভূমির হিসাব হতো বিঘা–কাঠা, কানি–গণ্ডা, আনা–কড়া প্রভৃতি দেশীয় ও প্রথাগত পদ্ধতিতে।
এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিগুলোর অন্যতম একটি হলো কড়া বিভাগ।
আজও বহু মৌজায়, জরিপ নকশা, পুরোনো খতিয়ান ও আমিনদের মুখে আমরা এই শব্দগুলো শুনে থাকি—
“দুই কড়া”, “সাড়ে তিন গণ্ডা”, “পৌনে এক আনা” ইত্যাদি।
এই প্রাচীন হিসাব-পদ্ধতিটি বোঝা গেলে জমির হিসাব অনেক সহজ ও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।
Table of Contents
কড়া বিভাগ
গান্টার শিকল (কড়া) এর ইতিহাস
ইংল্যান্ডের গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী Edmund Gunter (১৫৮১–১৬২৬) ভূমি পরিমাপ সহজ করার জন্য একটি ধাতব শিকল তৈরি করেন। এটি পরিচিত হয়—
Gunter’s Chain
বাংলায়: গান্টার শিকল / কড়া / চেইন
ব্রিটিশ আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে জরিপ চালানোর সময় এই শিকল ব্যবহৃত হয়। সেই সময় জমিদারি প্রথা, নীলচাষ ও রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য জমির নির্ভুল মাপ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। তখন থেকেই বাংলায় এই চেইন পদ্ধতি জনপ্রিয় হয় এবং গ্রামাঞ্চলে এটি “কড়া” নামে পরিচিত হয়।
গান্টার শিকলের পরিমাপ
| বিষয় | পরিমাণ |
|---|---|
| দৈর্ঘ্য | ৬৬ ফুট |
| মিটার | ২০.১২ মিটার (প্রায়) |
| ভাগ | ১০০ লিংক |
| ১০ চেইন × ১ চেইন | = ১ একর |
অর্থাৎ—
১০ বর্গ চেইন = ১ একর
কড়া বিভাগের মূল ধাপ
সূক্ষ্ম স্তর
| ধাপ | রূপান্তর |
|---|---|
| ২০ বিন্দু = | ১ ধূলা |
| ৪ ধূলা = | ১ রেণু |
| ৪ রেণু = | ১ তিল |
| ২০ তিল = | ১ কাগ |
| ৪ কাগ = | ১ কড়া |
| ৪ কড়া = | ১ গণ্ডা |
| ২০ গণ্ডা = | ১ আনা |
| ১৬ আনা = | ১ কাঠা |
| ২০ কাঠা = | ১ বিঘা |
কড়া → গণ্ডা গজ রূপান্তর
| কড়া | গণ্ডা |
| ১ কড়া = ৫ | পৌনে এক গণ্ডা |
| ২ কড়া = ৫½ | এক গণ্ডা |
| ৩ কড়া = ৫¾ | পৌনে দুই |
| ৪ কড়া = ৬ | দুই |
| ৫ কড়া = ৬½ | সোয়া দুই |
| ৬ কড়া = ৬¾ | আড়াই |
| ৭ কড়া = ৭ | সাড়ে দুই |
| ৮ কড়া = ৭½ | তিন |
| ৯ কড়া = ৮ | সোয়া তিন |
| ১০ কড়া = ৮½ | সাড়ে তিন |
| ১১ কড়া = ৯ | চার |
| ১২ কড়া = ৯½ | সোয়া চার |
| ১৩ কড়া = ১০ | সাড়ে চার |
| ১৪ কড়া = ১০½ | পাঁচ |
| ১৫ কড়া = ১১ | সোয়া পাঁচ |
| ১৬ কড়া = ১১½ | সাড়ে পাঁচ |
| ১৭ কড়া = ১২ | ছয় |
| ১৮ কড়া = ১২½ | সোয়া ছয় |
| ১৯ কড়া = ১৩ | সাড়ে ছয় |
| ২০ কড়া = ১৩½ | সাত |
| ২১ কড়া = ১৪ | সোয়া সাত |
| ২২ কড়া = ১৪½ | সাড়ে সাত |
| ২৩ কড়া = ১৫ | আট |
| ২৪ কড়া = ১৫½ | সোয়া আট |
| ২৫ কড়া = ১৬ | সাড়ে আট |
| ২৬ কড়া = ১৬½ | নয় |
| ২৭ কড়া = ১৭ | সোয়া নয় |
| ২৮ কড়া = ১৭½ | সাড়ে নয় |
| ২৯ কড়া = ১৮ | দশ |
| ৩০ কড়া = ১৮½ | সোয়া দশ |
| ৩১ কড়া = ১৯ | সাড়ে দশ |
| ৩২ কড়া = ১৯½ | এগারো |
| ৩৩ কড়া = ২০ | সোয়া এগারো |
| ৩৪ কড়া = ২০½ | সাড়ে এগারো |
| ৩৫ কড়া = ২১ | বারো |
| ৩৬ কড়া = ২১½ | সোয়া বারো |
| ৩৭ কড়া = ২২ | সাড়ে বারো |
| ৩৮ কড়া = ২২½ | তের |
| ৩৯ কড়া = ২৩ | সোয়া তের |
| ৪০ কড়া = ২৩½ | সাড়ে তের |
| ৮০ কড়া = | ১ আনা |
আনা পর্যন্ত কড়া বিভাগ
| কড়া | গজ | প্রচলিত নাম |
|---|---|---|
| ১ কড়া | ৫ | পৌনে এক গণ্ডা |
| ৪ কড়া | ৬ | দুই গণ্ডা |
| ৮ কড়া | ৭½ | তিন গণ্ডা |
| ১৬ কড়া | ১১½ | সাড়ে পাঁচ |
| ২০ কড়া | ১৩½ | সাত |
| ৪০ কড়া | ২৩½ | সাড়ে তের |
| ৮০ কড়া | — | ১ আনা |
কেন কড়া বিভাগ জানা জরুরি?
১. পুরোনো দলিল ও খতিয়ান বুঝতে
২. আমিন/সার্ভেয়ারদের হিসাব বুঝতে
৩. জমির প্রকৃত পরিমাণ যাচাই করতে
৪. প্রতারণা থেকে বাঁচতে
৫. জমি কেনাবেচায় দরদাম বুঝতে
আধুনিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক
আজ আমরা ব্যবহার করি—
- একর
- শতক
- বর্গমিটার
- হেক্টর
কিন্তু এই সবের ভিত্তিতেই রয়েছে গান্টারের কড়া পদ্ধতি।
অতএব, আধুনিক ভূমি ব্যবস্থার শিকড় এই প্রাচীন কড়া বিভাগেই নিহিত।





কড়া বিভাগ কেবল একটি গণনাপদ্ধতি নয়, এটি বাংলার ভূমি সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আজকের ডিজিটাল যুগেও এই প্রাচীন সূত্র আমাদের শেখায় কীভাবে জমিকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে মাপা যায়।
যদি আপনি জমির প্রকৃত মালিকানা বুঝতে চান, প্রতারণা থেকে বাঁচতে চান— তাহলে কড়া বিভাগ জানা আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি।